বলা হয়, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রগুলো খুব একটা ব্যবসা করে না। তবে এবারের পরিস্থিতি এতটা খারাপ হবে, তা অনেকেই প্রত্যাশা করেননি। সাম্প্রতিক অতীতে এমন চিত্র দেখা যায়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এবারের ঈদে মুক্তি পাওয়া আটটি চলচ্চিত্র নিয়ে এমনই মন্তব্য করছেন হলমালিকরা।
ঈদে মুক্তি পেয়েছে ‘রকস্টার’, ‘রইদ’, ‘বনলতা সেন’, ‘মালিক’, ‘পিনিক’, ‘অফিসার’, ‘তছনছ’ ও ‘মাসুদ রানা’। দেশের দুর্দশাগ্রস্ত এই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে বর্তমানে সচল প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা প্রায় ১৫০টি। ঈদ উপলক্ষে অল্প কিছু হল সাময়িকভাবে চালু হওয়ায় মোট প্রদর্শনযোগ্য হলের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৭০টি। এর মধ্যে দর্শক টানতে সক্ষম হয়েছে মূলত ‘রকস্টার’, ‘রইদ’, ‘মালিক’ ও ‘বনলতা সেন’।
শাকিব খান, নাবিলা ও তানজিয়া মিথিলার ‘রকস্টার’ ঈদে সর্বাধিক হল পেয়েছে। মাল্টিপ্লেক্স চেইন ও সাধারণ হল মিলিয়ে মোট ১০৩টি প্রেক্ষাগৃহে চলছে সিনেমাটি। ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্সে প্রথম দিনে শোর সংখ্যা ছিল ১৮টি, তবে দর্শক চাহিদা বাড়ায় এক দিনের ব্যবধানে তা বেড়ে ৩৬টিতে দাঁড়ায়।
বক্স অফিস পর্যবেক্ষণ সংস্থা বিএমআরএমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশের মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ওপেনিং অর্জন করেছে। এ বছর মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোর মধ্যে তানিম নূর পরিচালিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর প্রথম দিনের আয় ছিল ১৮ লাখ ৫৪ হাজার টাকা, শাকিব খানের ‘প্রিন্স: ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা’র ছিল ১৬ লাখ ১৯ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ আয় ছিল ‘দম’-এর ৩০ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। প্রথম দিনে মাল্টিপ্লেক্সের ৫৭টি শো থেকে ‘রকস্টার’-এর আয় দাঁড়ায় ২৯ লাখ ৪১ হাজার টাকা।
তবে দর্শক প্রতিক্রিয়া এবার একরৈখিক নয়। ভিড় থাকলেও মতামত এসেছে মিশ্র। অনেক দর্শক অ্যাকশনধর্মী ধারার বাইরে গিয়ে শাকিব খানকে রোমান্টিক চরিত্রে দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। আবার একটি অংশ সিনেমাটির সমালোচনাও করেছেন। এক দর্শকের মন্তব্য, শাকিব খান এ ধরনের সিনেমা করে নিজের ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত করছেন।
সিনেমাটির পরিচালক আজমান রুশো মুক্তির পর বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে ঘুরে দর্শকের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি বলেন, এই সিনেমায় অ্যাকশন বা আইটেম গান নেই। দীর্ঘদিন ধরে যে ধারা চলে আসছিল, সেখান থেকে ভিন্ন কিছু উপহার দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তারা।
ঈদের আনন্দ বাড়াতে সিনেমার তারকারাও বিভিন্ন হলে গিয়ে দর্শকের প্রতিক্রিয়া সরাসরি শোনেন।
মুক্তির আগে কিছু জটিলতার মুখেও পড়ে কয়েকটি সিনেমা। কনটেন্ট ফাইল সময়মতো না পৌঁছানোয় মুক্তির আগে ‘রকস্টার’ এবং ‘মাসুদ রানা’র শো টাইম প্রকাশ ও অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করতে পারেনি স্টার সিনেপ্লেক্স। এতে শঙ্কা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
আটটি সিনেমার একসঙ্গে মুক্তি এবং সীমিত প্রেক্ষাগৃহ সংখ্যা এবারের ঈদের বাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। সব সিনেমা কাঙ্ক্ষিত শো পায়নি। তারকাখ্যাতির কারণে ‘রকস্টার’ সর্বাধিক হল পেলেও ছোট ও মাঝারি বাজেটের সিনেমাগুলোকে সীমিত সংখ্যক শো নিয়েই প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে।
প্রযোজক নেতা ও কুমিল্লার কে-স্ক্রিনের মালিক খোরশেদ আলম খসরু বলেন, এবারের ঈদের ব্যবসা মন্দের ভালো বলা যায়। তার ভাষায়, দর্শকের প্রতিক্রিয়াই সব বলে দিচ্ছে। এতটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া আগে খুব কমই দেখা গেছে।
মধুমিতা সিনেমা হলের কর্ণধার ইফতেখার হোসেন নওশাদ জানান, সোমবার দুপুরের শোতে ‘রকস্টার’-এর টিকিট বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার টাকার এবং বিকেলের শোতে ৭ হাজার টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছে। তিনি বলেন, এত বিনিয়োগ করে হলের অবকাঠামো উন্নয়ন করা হলেও বড় বাজেটের সিনেমাগুলো মূলত মাল্টিপ্লেক্সকেন্দ্রিক হওয়ায় একক হলগুলো চাপের মুখে পড়ছে।
তিনি আরও জানান, দ্বিতীয় সপ্তাহেও ‘রকস্টার’ প্রদর্শন অব্যাহত থাকবে, এরপর ‘মালিক’ চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম সপ্তাহে তার হলে ‘রকস্টার’-এর প্রায় আড়াই লাখ টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছে। দ্বিতীয় সপ্তাহে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা বিক্রির আশা করছেন তিনি।
চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বলের মতে, একসঙ্গে আট থেকে দশটি সিনেমা মুক্তি এবং সীমিত প্রেক্ষাগৃহের কারণে এবারের ঈদের ব্যবসা প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি।
অন্যদিকে খসরু আরও বলেন, দর্শকের রুচি পরিবর্তনশীল এবং সেটি সবসময় পূর্বানুমান করা কঠিন। পাশাপাশি বিশ্বকাপ ও রাতজুড়ে খেলা দেখার কারণে দর্শক উপস্থিতি কমে যেতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘অনেক কিছু মিলিয়ে এ ঈদের বক্স অফিস জমে নাই।’


