ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে এবারও ধস নেমেছে। দুই দশক আগে ৩০ হাজার টাকা মুল্যের একটি গরুর চামড়া বিক্রি হতো এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায়। অথচ এবার ঈদে দেড় লাখ টাকার গরুর চামড়াতেও সেই দাম পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের চামড়া রপ্তানি থেকে ২০১০ সালের তুলনায় বর্তমানে অনেক কম আয় হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের চামড়া শিল্পে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ সনদ না থাকায় দেশের ট্যানারিগুলো প্রক্রিয়াজাত চামড়া বিশ্ববাজারে প্রকৃত দামে বিক্রি করতে পারছে না।
বর্তমানে রপ্তানিকৃত প্রক্রিয়াজাত চামড়ার প্রায় ৭০ শতাংশই কম দামে চীনে যাচ্ছে। কারণ, পরিবেশ ও মান নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত ঘাটতির কারণে দেশের অধিকাংশ ট্যানারি এখনো পশ্চিমা দেশের উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না।
পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর বিধিনিষেধের বাড়ার আগে ট্যানারিগুলো রপ্তানি চামড়ার ভালো দাম পেত। স্থানীয় পাইকার ও আড়তদাররাও তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করতেন।
একসময় ঈদুল আজহা মানেই ছিল মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের তীব্র প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন এলাকায় তরুণরা চামড়া সংগ্রহের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামত, যা অনেক সময় স্থানীয় প্রভাব-প্রতিপত্তির প্রদর্শনীতেও রূপ নিতে দেখা গেছে।
তবে এখন আর সেই প্রতিযোগিতা নেই। কোরবানিদাতাদের বড় একটি অংশ এখন চামড়া বিক্রি না করে সরাসরি মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় দান করছেন।
রাজধানীর ঢাকার বনশ্রী এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এক লাখ ৪০ হাজার টাকায় কেনা গরুর চামড়ার জন্য সংগ্রহকারীরা মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দাম বলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত আমরা পাশের একটি মাদ্রাসায় চামড়াটি দান করেছি।’
তার ভাষায়, চামড়া বিক্রি করলে সেই টাকা কোরবানির অংশীদারদের মধ্যে ভাগ করে তারপর গরিবদের দিতে হতো। এতে কারও ভাগে দেড়শ থেকে দুইশ টাকার বেশি পড়তো না। অল্প টাকার জন্য এত ঝামেলায় যেতে চাননি তারা।
এবার অবশ্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মসজিদ ও মাদ্রাসার প্রতিনিধিদের ঘরে ঘরে গিয়ে চামড়া সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের ভবনের সামনে ছোট বুথও বসিয়েছে। সেখানে চামড়া দানকারীদের চা, বিস্কুট ও পানি খাওয়াতে দেখা যায়।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শাহীন আহমেদ বলেন, ‘গত বছর দেশে প্রায় ৯০ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল। তবে কোরবানির পশু বিক্রির পরিসংখ্যান হিসাবে এবার সেই সংখ্যা অন্তত ১০ লাখ কমে যেতে পারে।’
‘গত বছর সারা দেশে সংগৃহীত চামড়ার হিসাবে প্রায় ৫০ লাখ গরু কোরবানি হয়েছিল। এবার দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও আয় সংকটের কারণে মানুষের ব্যয় কমে যাওয়ায় সেই সংখ্যা ৪৫ লাখে নেমে আসতে পারে’, যোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশের ট্যানারিগুলো বছরে যে পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে, তার অন্তত অর্ধেকই আসে ঈদুল আজহার সময়। ফলে এই উৎসবই চামড়া শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম।
এদিকে ঈদুল আজহা উপলক্ষে ২০২৬ সালের জন্য সরকার লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার নির্ধারিত দাম প্রতি বর্গফুটে দুই থেকে তিন টাকা বাড়িয়েছে।
সরকার নির্ধারিত দরে ঢাকায় গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে বাস্তবে অনেক বিক্রেতাই এই সরকারি দাম পাচ্ছেন না।
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে কোরবানি দেওয়া পোশাক খাতের কর্মকর্তা শরীফ জানান, স্থানীয় সংগ্রহকারীরা সরকারি দামের অর্ধেকেরও কম দাম প্রস্তাব করেছেন। পরে তিনিও চামড়াটি স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় দান করেন।
রাজধানীর রামপুরা এলাকায় একটি মাদ্রাসার পক্ষে বিনা মূল্যে চামড়া সংগ্রহ করছিলেন শিক্ষক মাসুদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘গত বছরের মতো এবারও মানুষ মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি না করে মসজিদ ও মাদ্রাসায় চামড়া দান করছেন।’
মাসুদুর রহমান জানান, সংগ্রহের পর বিকালে একটি পক্ষ এসে দর ঠিক করে মাদ্রাসা থেকে চামড়া নিয়ে আড়তে যাবে। এই অর্থ দিয়ে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষা ও খাবারের খরচ চালানো হবে।
বুড়িগঙ্গা নদী দূষণের অভিযোগে দীর্ঘদিনের সমালোচনার পর পতিত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৭ সালে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সব ট্যানারি সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়।
কিন্তু সেখানে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে কারখানাগুলো পশ্চিমা ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’-এর সনদ পাচ্ছে না।
ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শাহীন আহমেদ বর্জ্য শোধনাগার দ্রুত ও পুরোপুরি চালুর দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘শুধু একটি শোধনাগার পুরোপুরি চালু না হওয়ার কারণে চামড়ার মতো জাতীয় সম্পদ ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।’


