জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচনের আগে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মন জয়ে ইসলামী ছাত্র শিবির সমর্থিত প্যানেলের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে চার মাসেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। এই ব্যর্থতার জন্য এখন সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আন্তরিকতা ও সহযোগিতার অভাবকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাচ্ছেন জকসুর সাধারণ সম্পাদক।
গত বছরের ২১ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে জকসু নির্বাচনের জন্য ২১ দফার নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছিল ইসলামী ছাত্র শিবির সমর্থিত প্যানেল অদম্য জবিয়ান ঐক্য। সে সময় প্যানেলের নেতারা জোর দিয়ে বলেছিলেন, তারা শিক্ষার্থীদের সামনে কোনো প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নিয়ে আসেননি।
কিন্তু চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়লাভের পর চার মাস কেটে গেলেও ইশতেহারের মূল অঙ্গীকারগুলোর বাস্তবায়ন স্থবির হয়ে আছে। ছাত্র শিবিরের দেওয়া এই দীর্ঘ ইশতেহারে এমন অনেক প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা সরাসরি ছাত্র সংসদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। এর মধ্যে অন্যতম কেরানীগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণ এবং আবাসন প্রকল্প দ্রুত শেষ করার জন্য সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় সাধন করা। একই সঙ্গে পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত হলগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করার বিষয়টিও ইশতেহারে রাখা হয়।
চার মাস সময় পার হলেও দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণের বিষয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে জকসুর একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি। একইভাবে পুরান ঢাকার হলগুলো উদ্ধারে বা নির্মাণে জকসু নেতৃত্বের দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা শিক্ষার্থীদের সামনে আসেনি।
অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদালয়েও, যেখানে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের হলে আসন বরাদ্দ এবং হল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জয়ী হওয়া শিবির নেতারা এখন বলছেন, এগুলো এককভাবে করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
জকসুর নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম বাস্তবায়ন, শ্রেণিকক্ষ আধুনিকায়ন, স্টারলিংক ইন্টারনেট সংযোগ, গবেষণার জন্য বিশেষ বৃত্তি বৃদ্ধি, ল্যাব সমৃদ্ধকরণ এবং আন্তবিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ ফেস্ট ও কর্মশালার আয়োজনের কথা বলা হয়েছিল।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে বই, জার্নাল ও ডিজিটাল রিসোর্স বৃদ্ধি, ক্যাফেটেরিয়ার সুবিধা বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ক্যাম্পাসকে মাদকমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘প্রোটেক্ট জবিয়ানস’ অ্যাপ এবং বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা চালুর অঙ্গীকারও করেছিল এই প্যানেল।
অবশ্য এই চার মাসে জকসুর মাধ্যমে কিছু কাজ সম্পাদিত হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বাস ট্র্যাকিং অ্যাপ ‘JnU Express’ চালু, গ্লোবাল অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক গঠন, অনলাইনে ফলাফল দেখার ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স কর্নার স্থাপন, আইন অনুষদে ডিএলআর চালু, শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে আইইএলটিএস ও গ্রাফিক্স ডিজাইন কোর্স, আন্তর্জাতিক শিক্ষা মেলা আয়োজন এবং ব্রিলিয়ান্ট ব্রেইনস ভ্যালির সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর।
এ ছাড়া পরীক্ষামূলকভাবে স্থাপন করা স্টারলিংক ইন্টারনেট সঠিকভাবে কাজ না করায় বর্তমানে নতুনভাবে রাউটার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে ছাত্র সংসদ। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতে, এগুলো তাদের মৌলিক সংকট সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়।
জকসুর এই চার মাসের কার্যক্রম নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম জানান, চার মাস দীর্ঘ সময় হলেও জকসু নির্বাচনের আগে দেওয়া মূল প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী তানজিম হোসেন বলেন, জকসু অনেকাংশেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অনেক আশা-প্রত্যাশা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যাদের ভোট দিয়ে জয়ী করেছিল, সেই প্রতিনিধিরা এখন শিক্ষার্থীদের আস্থা হারাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধাসহ যেসব মৌলিক কাজ সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাওয়ার কথা ছিল, জকসু নেতৃত্ব সেই মূল জায়গা থেকে দূরে সরে গেছেন।
ছাত্র অধিকার পরিষদের সাবেক সভাপতি একেএম রাকিব এ বিষয়ে বলেন, নির্বাচনের পর ক্যাম্পাসে দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের নিম্নমান, আবাসন সমস্যা সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ কিংবা সম্পূরক বৃত্তির ব্যবস্থা–সবকিছুই আগের মতোই স্থবির হয়ে আছে। জকসু নেতৃত্বের উচিত তাদের মৌলিক ও প্রধান কাজগুলোর দিকে অবিলম্বে নজর দেওয়া।
অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতারাও জকসুর বর্তমান কার্যকলাপে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেভাবে চেয়েছিল, জকসু সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ছাত্র সংসদের দায়িত্ব হলো দল-মত নির্বিশেষে সকলের জন্য কাজ করা। কিন্তু জকসুর মূল নেতৃত্বে একটি বিশেষ রাজনৈতিক সংগঠনের পদে থাকায় তারা ছাত্র সংসদের মৌলিক কাজগুলো করতে পারছেন না। তারা হয়তো কাজ করার চেষ্টা করছেন, তবে শিক্ষার্থীদের সামনে তাদের কোনো দৃশ্যমান কাজ নেই।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি ইভান তাহসীভ বলেন, ছাত্র সংসদের প্রধান এবং অন্যতম মৌলিক কাজ হলো ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সংকটে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে আন্দোলন গড়ে তোলা এবং প্রশাসনের কাছ থেকে দাবিগুলো আদায় করে নেওয়া। জকসু সেই আন্দোলনের চরিত্র গঠন ও দাবি আদায়ে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়ে জকসুর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যার পাহাড় এক বছরের মেয়াদে সমাধান করার কথা চিন্তা করাও বোকামি।
তিনি আরও বলেন, সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আন্তরিকতা ও পূর্ণ সহযোগিতা পেলে বেশ কিছু কাজ এগিয়ে নেওয়া যেত। কিন্তু জকসু প্রশাসন বা সরকারের পক্ষ থেকে সেই সহযোগিতা পাচ্ছে না। আলিম আরিফ বলেন, মেয়াদ শেষে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই বিচার করবে জকসু তাদের প্রত্যাশা কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছে।
তবে নির্বাচনের আগে কেন এমন অসম্ভব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি এই শিবির নেতা।
দল নিরপেক্ষ প্রার্থী হিসেবে জয়ী জকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য জাহিদ হাসান স্বীকার করেন, নীতি নির্ধারণের জায়গায় জকসু অনেক বেশি দুর্বল। তিনি মনে করেন, তিনি নিজে এবং জকসুর বাকি সকল সদস্যেরই সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজে আরও বেশি তৎপর ও সক্রিয় হওয়া উচিত।
জকসুর মোট ২১টি পদের মধ্যে সহ-সভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) সহ ১৬টি পদেই জয়লাভ করে ছাত্র শিবির সমর্থিত প্যানেল। বাকি ৫টি পদে অন্যান্য প্যানেল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এই ১৬ জন শিবির নেতার সঙ্গে বাকি ৫ জন নির্বাচিত প্রতিনিধির এক ধরনের নীতিগত দ্বন্দ্ব ও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ছাত্রদলের প্যানেল থেকে বিজয়ী চারজন প্রতিনিধিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিবির সমর্থিত ১৬ জনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এবং তাদের জকসু থেকে অব্যাহতির দাবি করতেও দেখা গেছে।
ছাত্র সংসদ নেতৃত্বের এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী লিমন ইসলাম বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে এমন বিভাজন ও দূরত্বের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, জকসুকে অবশ্যই সব ধরনের দলীয় সংকীর্ণতা ও মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে, তবেই ক্যাম্পাসে একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব হবে।
ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান’ প্যানেল থেকে জয়ী সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য সম্পাদক তাকরিম মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে উদ্দেশ্যে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা জকসু চেয়েছিলাম, সেই মূল উদ্দেশ্য মোটেও পূরণ হচ্ছে না।’
তিনি জানান, জকসু’র ব্যর্থতার প্রধান কারণ সংখ্যাগত অসমতা। ছাত্র শিবির প্যানেলের প্রতিনিধি সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে তারা যেকোনো সিদ্ধান্ত একপাক্ষিক ও এককভাবে জকসুর নামে চালিয়ে দেয়। শিবির প্যানেলের বাইরের বাকি ৫ জনের মতামতের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই।
এ কারণে তিনি নিজে এখন জকসুর ব্যানারের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করার সুযোগ খুঁজছেন বলে জানান তাকরিম।
ছাত্রশক্তির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক ফয়সাল মুরাদ এনিয়ে বলেন, জকসু এখন পর্যন্ত ক্যাম্পাসের সকল শিক্ষার্থীর জন্য একটি সার্বজনীন প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারেনি। একটি নির্দিষ্ট দলীয় প্যানেল থেকে নির্বাচিতরা মূলত তাদের দলের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছে। ফলে ছাত্র সংসদ যেভাবে ফলপ্রসূ ও কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য তা মোটেও হয়ে উঠতে পারছে না।
তবে জকসুর জিএস আব্দুল আলিম আরিফ নেতৃত্বের এই বিভক্তির বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তিনি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, এক জায়গায় যখন অনেক মানুষ একসঙ্গে কাজ করে, তখন তাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা খুবই স্বাভাবিক। এটিকে জকসুর বিভক্তি বলার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘আমাদের সবার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করা এবং আমরা সবাই মিলে সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছি।’


