চট্টগ্রামের পশুর হাটে চাঁদাবাজি রুখতে পুলিশের ড্রোন

চট্টগ্রামের পশুর হাটে চাঁদাবাজি রুখতে পুলিশের ড্রোন
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে পশুর হাটে চাঁদাবাজি, দালালের দৌরাত্ম্য, চুরি এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্রথমবারের মতো ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। তবে এখন পর্যন্ত হাটগুলোতে এই প্রযুক্তির বাস্তব ব্যবহার দেখা যায়নি।

অবশ্য মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা জোরদার করতে সিএমপি ইতিমধ্যেই সিসিটিভি নজরদারি, ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন এবং টাকা বহনে বিশেষ এসকর্ট সুবিধাসহ বহু স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানিয়েছেন, চাঁদাবাজিসহ সব ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড রুখতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, নগরের ১৫টি প্রধান পশুর হাটে ড্রোন দিয়ে নজরদারি চালানো হবে। প্রতিটি হাটে পুলিশের একটি করে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থাকবে এবং অন-সাইট নজরদারির ব্যবস্থা করা হবে।

কমিশনার আরও জানান, পশুবাহী প্রতিটি যানবাহনে গন্তব্যস্থলের হাটের নাম লিখে ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেন হাটের ইজারাদারেরা জোরপূর্বক যত্রতত্র ট্রাক থামাতে না পারেন।

মুরাদপুরের বিবিরহাট পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, হাটটি এখনও পুরোপুরি জমে ওঠেনি। তবে ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জোর প্রস্তুতি চলছে। সেখানে অস্থায়ী শেড তৈরি করা হচ্ছে, ট্রাক পার্কিংয়ের জায়গা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং পশু বাঁধার জন্য খুঁটি পোঁতা হচ্ছে।

স্থানীয়দের ধারণা, ঈদের শেষ দিনগুলোতে পশুবাহী ট্রাকের ব্যাপক চাপ তৈরি হবে। এলাকাবাসী জানান, বিগত বছরগুলোতে ঈদের শেষ সময়ে বিবিরহাট ও এর চারপাশের এলাকায় ক্রেতা ও ট্রাকের কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছিল। ইতিমধ্যে রেললাইনের পাশে অস্থায়ী পশুর খোঁয়াড় তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। বাজারে এখনো পশুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি দেখা গেছে।

সিএমপি সূত্র জানায়, অনুমোদিত প্রায় ১৫টি পশুর হাটে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ হাটে প্রতি শিফটে ১৫ থেকে ১৬ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকছেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চাঁদাবাজি, চুরি এবং দালাল চক্রের কারণে তারা মারাত্মক সমস্যায় পড়েছেন। ব্যস্ততম হাটের দিনগুলোতে অপরাধী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বলে এখনও তাদের মনে আতঙ্ক রয়েছে।

আরও পড়ুন

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের উত্তর বিভাগের মুরাদপুর থেকে বায়েজিদ পর্যন্ত এলাকাটি শহরের সবচেয়ে অপরাধপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এই এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের হার অনেক বেশি, যেখানে বড় সাজ্জাদ এবং বার্মা সাইফুল নামের কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের নেতৃত্বাধীন গ্যাং পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি এই এলাকায় এক গোলাগুলির ঘটনায় হাসান রাজু নামে এক গ্যাং সদস্য নিহত হয়। ওই হামলায় রেশমি আক্তার নামে ১১ বছরের এক শিশুও প্রাণ হারায়। এর আগে সাজ্জাদের গ্রুপের হাতে সারোয়ার বাবলা নামের আরেক গ্যাং সদস্য খুন হয়েছিল। বার্মা সাইফুল বর্তমানে কারাগারে থাকলেও বড় সাজ্জাদ এখনো স্থানীয় অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ওই এলাকায় বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে চাঁদার ফোন আসছে। দাবি করা টাকা না দেওয়ায় কয়েকজনের বাড়িতে গুলিও চালানো হয়েছে।

ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা নতুন করে সহিংসতা ও অপরাধীদের হুমকির আশঙ্কায় চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘এই হাটগুলোতে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। এ সময় কিছু অপরাধী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। আমরা চাই পুলিশ যেন আগেভাগেই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেয়।’

এমন পরিস্থিতিতে ড্রোন মোতায়েনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন অনেকে। কক্সবাজার থেকে বিবিরহাটে আসা জাহাঙ্গীর আলম নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘হাটে পশু আনার পর আমাদের সবচেয়ে বড় ভয় থাকে টাকা নিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফেরা। ড্রোন আর পুলিশের টহল থাকলে অপরাধীরা সুযোগ কম পাবে।’

সিএমপি কর্মকর্তারা আরও জানান, সব অনুমোদিত হাট ড্রোনের নজরদারির আওতায় থাকবে।  প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট থানায় অতিরিক্ত ড্রোন সরবরাহ করা হবে।

তবে ড্রোন মোতায়েনের বিষয়ে থানাগুলো এখনও চূড়ান্ত কার্যপ্রণালী বা নির্দেশনা পায়নি। পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, হাটের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে ড্রোন ব্যবহার করা হতে পারে। তবে মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোকে এখনও এর সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি সম্পর্কে জানানো হয়নি।

সিএমপি কমিশনার জোর দিয়ে বলেন, কোনো হাটে চাঁদাবাজি, চুরি বা বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সিএমপির নির্দেশনা অনুযায়ী, হাটের ইজারাদারদের অবশ্যই নিজ দায়িত্বে প্রতিটি হাটে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ওয়াচ টাওয়ার বসানো হবে।

আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি হাটে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিদের পরিচালনায় একটি করে বিশেষ বুথ থাকবে, যা জাল নোট শনাক্তকরণ মেশিনে সুসজ্জিত থাকবে। এছাড়া ব্যবসায়ীরা পশু বিক্রির পর নগদ টাকা পরিবহনের সময় পুলিশের ‘মানি এসকর্ট’ বা টাকা বহনের বিশেষ নিরাপত্তা সুবিধা নেওয়ার অনুরোধ জানাতে পারবেন।

পশুর হাটকে কেন্দ্র করে সক্রিয় অপরাধী চক্রের তালিকা ইতিমধ্যেই তৈরি করেছে সিএমপি। এর পাশাপাশি কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে কোনো সিন্ডিকেট যেন হাট নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখবে কর্তৃপক্ষ।

নিরাপত্তার পাশাপাশি হাটগুলোতে জরুরি স্বাস্থ্যসেবাও দেওয়া হবে। সেখানে মেডিকেল ক্যাম্প, ভেটেরিনারি বা পশুপালনের চিকিৎসকদের দল এবং ফায়ার সার্ভিসের প্রতিনিধিরা নিয়োজিত থাকবেন। হাটের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবক দলগুলোর সাথে সমন্বয় করে কাজ করছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad