দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া একটি সরকারি প্রকল্পের অগ্রাধিকারের বিষয়টি সবাইকে চমকে দিয়েছে। পুরো প্রকল্পের মোট বাজেট ৪৩১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
এর মধ্যে মাত্র ১৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা বা চার শতাংশের কিছু বেশি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৫৩টি খাদ্য গুদাম মেরামতের জন্য। অথচ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ও অফিস ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২০০ কোটি টাকার বিশাল অংক।
সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) এক সভায় এই অসংগতির বিষয়টি উঠে আসে। খাদ্য নিরাপত্তার মতো একটি স্পর্শকাতর প্রকল্পে মূল কাজ অর্থাৎ খাদ্য গুদামজাতকরণকে বাদ দিয়ে আবাসন খাতকে কেন এতটা অগ্রাধিকার দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কর্মকর্তারা।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য সচিব মো. মাহমুদুল হোসেন খান ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, প্রকল্পের নামের সঙ্গে এর মূল কাজের কোনো মিল নেই। তাই এটি অনুমোদনের আগে প্রয়োজনীয় সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) খাদ্য গুদাম মেরামতের চেয়ে অন্যান্য খাতে বেশি খরচের হিসাব দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ ও অয়্যারিংয়ের জন্য ২২ কোটি ৮২ লাখ টাকা এবং ভূমি উন্নয়নের জন্য ১৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া পরিবহন, বাড়িভাড়া, উৎসব ভাতা, কম্পিউটার, এয়ার কন্ডিশনার, ফটোকপি মেশিন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচের জন্য আরও ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাবেক সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, একটি প্রকল্পের নাম সবসময় তার মূল উদ্দেশ্য এবং মূল কাজের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হওয়া উচিত। তিনি আরও জানান, যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প জমা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নিজস্ব যাচাই কমিটির আরও বেশি দায়িত্বশীলতা ও সতর্কতার সঙ্গে কাজ করা উচিত।
পিইসি সভায় কর্মকর্তারা প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো, কাজের অগ্রাধিকার ও এর যৌক্তিকতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে প্রকল্প যাচাই ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়।
পরিকল্পনা কমিশন এই প্রকল্পের বেশ কিছু খাতের বাজেট নিয়ে অনিয়ম ও স্বচ্ছতার অভাবের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ডিপিপিতে ‘সম্মানী’ খাতটি দুইবার যুক্ত করা হয়েছে। এক জায়গায় ১৪ লাখ টাকা এবং অন্য জায়গায় ১ লাখ ৬৯ হাজার টাকা চাওয়া হলেও এই টাকা কারা পাবেন তা স্পষ্ট করা হয়নি।
প্রকল্প এলাকায় যাতায়াত খরচের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ টাকা, যেখানে মাসিক গাড়ি ভাড়া ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া ৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫ হাজার ৯০৪টি প্লাস্টিক ডানেজ (খাদ্যশস্য রাখার বিশেষ পাটাতন) কেনার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ল্যাপটপ, কম্পিউটার এবং আসবাবপত্র কেনার জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হলেও ডিপিপিতে এগুলোর সংখ্যা বা একক মূল্য উল্লেখ করা হয়নি।
পরামর্শকদের (কনসালট্যান্ট) জন্য প্রকল্পে ৮ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। তবে কতজন পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে কিংবা তাদের দায়িত্ব কী হবে, তা পরিষ্কার করা হয়নি।
বর্তমান নেতিবাচক আর্থিক পরিস্থিতিতে পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ৪৩১ কোটি টাকার এই প্রকল্প নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জামাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের অধিকাংশ পুরোনো গুদাম জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এগুলো দ্রুত মেরামত করা প্রয়োজন। এরপরও আমরা প্রকল্পটির ওপর কাজ করছি, অপ্রয়োজনীয় খাতগুলো বাদ দেওয়া হবে।’
তবে খাদ্য গুদামের পাশাপাশি প্রকল্প এলাকার অন্যান্য ভবনও নির্মাণ করা দরকার বলে জানান তিনি। প্রকল্পের নাম নিয়ে ওঠা আপত্তির বিষয়ে তিনি বলেন, নাম নির্ধারণে কিছুটা ভুল হয়েছিল। চাহিদা অনুযায়ী এটি সংশোধন করা হবে।
খাদ্য অধিদপ্তর এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে, যার পোশাকি নাম ‘তিনটি সিএসডি এবং একটি এলএসডি খাদ্য গুদাম ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধার মেরামত, নির্মাণ এবং পুনর্নির্মাণ’।
অধিদপ্তর জানিয়েছে, পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতা না থাকায় সরকারের খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তাই খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা বাড়াতে গুদামগুলোর আধুনিকায়ন ও মেরামত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় খুলনা, তেজগাঁও ও নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় খাদ্য গুদাম (সিএসডি) এবং ধর্মপুর স্থানীয় খাদ্য গুদামের (এলএসডি) সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হবে। ১৯৪৪ থেকে ১৯৫৯ সালের মধ্যে নির্মিত এই স্থাপনাগুলো এখন অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। প্রকল্পটির কাজ শেষ হলে দেশে আরও অতিরিক্ত ৬৫ হাজার ৮০০ টন খাদ্যশস্য মজুতের সক্ষমতা তৈরি হবে।
ডিপিপি অনুযায়ী, ৫০০ টন ধারণক্ষমতার ১৬টি গুদাম, ১ হাজার টন ধারণক্ষমতার ৩৬টি গুদাম এবং ১৩০০ টন ধারণক্ষমতার ১টি গুদাম মেরামত করা হবে। নারায়ণগঞ্জে ২ কোটি ০৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫০০ টনের ৯টি গুদাম মেরামত করা হবে। খুলনায় ১২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার টনের ২৯টি গুদাম সংস্কার করা হবে।
এ ছাড়া তেজগাঁওয়ে ৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫০০ টনের ৭টি এবং ১ হাজার ৩০০ টনের ১টি গুদাম মেরামত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটিতে আবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য ১৮৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা এবং অনাবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য ১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তেজগাঁওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোয়ার্টার বা আবাসন নির্মাণের জন্য সবচেয়ে বেশি ৬৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ ও খুলনায় ম্যানেজার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারদের বাসস্থান এবং দুটি রেস্ট হাউস নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যার প্রতিটি রেস্ট হাউসের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।


