দেশে একের পর এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার মধ্যে মিরপুরের নৃশংস ঘটনাটি শিশুর সুরক্ষা ও সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে বাবা-মাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি করেছে। এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আদালতে মামলার ক্রমবর্ধমান জট।
আইনজীবীরা বলছেন, যেসব হাইপ্রোফাইল ঘটনা জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে সেগুলোর তদন্ত ও বিচার তুলনামূলক দ্রুত হয়। তবে বাকি মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার মিরপুরে এক প্রতিবেশী সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য দেশের এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যেই অন্তত ১৬৫ জন শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে।
তা ছাড়া শিক্ষক, গৃহকর্মী ও প্রতিবেশীদের মতো পরিচিত মানুষদের মাধ্যমে অন্তত ৬৭ জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ মাসের ব্যবধানে ৫২২ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এই হিসাবে প্রতি মাসে মারা গেছে গড়ে ৩২ জন শিশু।
একই সময়ে ধর্ষণসহ এক হাজার ২২৩ জন শিশু চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যা প্রতি মাসে গড়ে ৭৬ জনেরও বেশি।
প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা সম্ভবত আরও অনেক বেশি, কারণ এই পরিসংখ্যানগুলো কেবলমাত্র গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম সোহাগ এ বিষয়ে বলেন, “হত্যাকারী ও ধর্ষকদের মধ্যে প্রায়ই শৈশবে মানসিক ব্যাধি তৈরি হয়।
পরিবার থেকে তাদের মানসিক চাহিদা পূরণ না হলে তারা পরবর্তীতে মানসিক কষ্ট ও হতাশায় ভোগে, যা তাদের মধ্যে হীনম্মন্যতার জন্ম দেয়। এই ঘাটতি পূরণ করতে তারা শিশুদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে একটি কৃত্রিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।”
মামলার নথি থেকে জানা যায়, এই অপরাধীদের শৈশব থেকেই স্কুল পালানো, মাদকাসক্তি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ইতিহাস থাকে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ধর্ষণের পর ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় তৈরি হলে তারা প্রায়ই শিশুটিকে হত্যার পথ বেছে নেয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই অপরাধগুলো মূলত পরিবারের কোনো ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বা ভুক্তভোগীর পরিচিত কেউ ঘটিয়ে থাকে।
‘আমরা কার কাছে বলব?’
ঢাকার কর্মজীবী মায়েদের জন্য সন্তান লালন-পালন এখন এক সার্বক্ষণিক সতর্কতার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাহিদা খানম নামের একজন আইনজীবী বলেন, “আমার মেয়ে স্কুলে থাকে। বাসায় গৃহকর্মী আছে, তাও আমার মন থেকে ভয় দূর হয় না। আমি পুরো বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়ে সেগুলো ফোনের সঙ্গে যুক্ত করেছি। অফিসে বসে আমি সারাদিন তাকে চোখে চোখে রাখি।”
সাংবাদিক ফারাহ জাবিন শামীও একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে যতক্ষণ না কলেজের গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকে, ততক্ষণ আমি অস্থির থাকি। সে কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। আমি নিজে সব জায়গায় তার সাথে যাই, এমনকি কোচিং সেন্টারেও। যেকোনো সময় কী ঘটে যাবে তা জানা যায় না বলে সহজেই আতঙ্ক ভর করে। বিচার ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ না করা পর্যন্ত এটি থামবে না। কিন্তু এখন আমরা কার কাছে অভিযোগ করব?’
মিরপুরের বাসিন্দাদের মধ্যেও এই উদ্বেগ একইভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানকার বাসিন্দা রাশিদা আক্তার বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের সন্তানরা ভালোভাবে বড় হোক। কিন্তু এখন আমরা সব জায়গাকেই সন্দেহের চোখে দেখি।’ তার ১২ বছর বয়সী মেয়ে সোহা ভ্যানে করে স্কুল ও কোচিংয়ে যাতায়াত করে। রাশিদা আক্তার আরও বলেন, ‘ভ্যান আসতে সামান্য দেরি হলেই আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি।’
গাজীপুরের একজন অভিভাবক সাইফুল ইসলাম উল্লেখ করেন, শিশুরা নিজেদের নিরাপদ মনে করার যে ন্যূনতম আস্থা পেত, তা এখন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
এই আতঙ্ক কেবল মেয়েদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ছেলেদেরও সমানভাবে প্রভাবিত করছে।
পুরান ঢাকার সুমনা বেগম ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে বারবার ঘটে যাওয়া নির্যাতনের খবর জানতে পেরে সম্প্রতি তার দুই ছেলে—ছয় বছর বয়সী নেহাল এবং আট বছর বয়সী তানজিমকে যাত্রাবাড়ীর একটি মাদ্রাসা থেকে নিয়ে এসেছেন।
সুমনা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই দেশে সন্তান জন্ম দেওয়াটাই এখন অপরাধ বলে মনে হয়। অভিভাবকরা কি ২৪ ঘণ্টা তাদের সন্তানদের পাহারা দিতে পারেন? আমরা কিছুটা বিশ্বাস নিয়ে আমাদের সন্তানদের এই জায়গায় পাঠাই। সেই নিরাপদ আশ্রয়গুলোই যদি অপরাধের জায়গায় পরিণত হয়, তবে মানুষ কোথায় যাবে?’
মাদ্রাসার ভেতরে যৌন নির্যাতনের বিষয় নিয়ে বছরের পর বছর ধরে মৃদু স্বরে আলোচনা হলেও ধর্মীয় সংবেদনশীলতার কারণে আইনিভাবে এর মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন।
তবে পরিসংখ্যানের চিত্রটি স্পষ্ট। মানবাধিকার সংস্থা আসকের সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সারা দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় ২১১টি যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
জনক্ষোভ ছাড়া বিচার নেই
২০২৫ সালের মার্চ মাসে মাগুরায় আট বছর বয়সী এক বালিকাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এর ফলে আড়াই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে একটি ব্যতিক্রমী ও দ্রুত রায় পাওয়া যায়।
পুলিশের তথ্যমতে, অপরাধী হিটু শেখ ২০২৫ সালের ৫ মার্চ ওই শিশুটিকে নির্যাতন করে। পরে ১৩ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা যায়।
জনরোষের মুখে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। ওই বছরের ১৭ মে মাগুরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান অপরাধী হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন। মামলাটি বর্তমানে হাইকোর্টে চূড়ান্ত আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
তবে যেসব ঘটনা জনসমক্ষে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করতে পারে না, সেগুলোর তদন্ত ও বিচার উভয় ক্ষেত্রেই মারাত্মক দেরি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদ্ধতিগত ব্যর্থতা শিশুদের আরও বেশি ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বর্তমানে কেবল ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতেই ৩ হাজারেরও বেশি মামলা ঝুলে আছে, যার একটি বড় অংশই শিশুদের বিরুদ্ধে হওয়া অপরাধের সঙ্গে জড়িত।
আইনজীবী এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বিচার ব্যবস্থার ভেতরের কিছু বড় প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করেছেন।
ঢাকা মহানগর আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের একজন আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, “এই বিলম্বের দুটি প্রধান কারণ রয়েছে: দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়া এবং আদালতে সাক্ষী হাজির করার অসুবিধা। সাক্ষীদের খুঁজে বের করা প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে যখন তদন্তকারী কর্মকর্তারা অন্য স্টেশনে বদলি হয়ে যান, যা মামলার স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করে।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) একজন আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার আরেকটি বড় সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সময়মতো চিকিৎসা ও ফরেনসিক প্রতিবেদন না পাওয়া আইনি প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে স্থবির করে দেয়।’
এসব কাঠামোগত বাধা সত্ত্বেও ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী আশাবাদী মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের বিষয়ে অত্যন্ত সক্রিয়। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে খুব শিগগিরই এই জঘন্য অপরাধের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’
তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে এই আশা এখন তিক্ত হতাশায় পরিণত হয়েছে।
মিরপুরে সম্প্রতি নির্মমভাবে নিহত হওয়া শিশুটির বাবা সাংবাদিকদের কাছে তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি আমার মেয়ে হত্যার বিচারও চাই না। আপনারা তো বিচার করতে পারবেনই না।’
শিশুটির মা-ও কাঁদতে কাঁদতে একই আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি কোনো বিচার চাই না। কারণ এই দেশে কোনো বিচার হয় না।’
এই ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় সুপ্রিম কোর্টের আটজন আইনজীবী প্রধান বিচারপতির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন। বিশাল মামলার জট এবং বর্তমান বিচারিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তারা শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, মিরপুরের সাম্প্রতিক শিশু হত্যার ঘটনা তদন্ত করে দ্রুত চার্জশিট দেওয়া হবে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে এক সপ্তাহের মধ্যে আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
সমস্যার মূল জায়গার ওপর জোর দিয়ে ‘এসওএস চিলড্রেনস ভিলেজেস বাংলাদেশ’-এর উপ-পরিচালক ও আইনজীবী নুসরাত জাহান বলেন, ‘শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করা কেবল মানবিক দায়িত্বই নয়; এটি একটি ন্যায়সংগত সমাজ গঠনের মৌলিক শর্ত। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের উদ্যোগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।’


