জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় সারাদেশে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানায়, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলো অনলাইন এবং অফলাইন—উভয় মাধ্যমেই ছদ্মনামে সদস্য সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার সুযোগ খুঁজছে বলেও ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
একাধিক সংস্থার গোপনীয় প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রতিটি ইউনিটকে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। তদন্তকারীরা জানান, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট সম্প্রতি নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর বেশ কিছু গোপন তৎপরতার প্রমাণ পেয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হাসান ও রানা নামে ছদ্মনামধারী দুই সন্দেহভাজন জঙ্গি সিলেট এবং ঢাকার অদূরে ধামরাই এলাকায় অবস্থান করছে। গত ২৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সতর্ক করা হয়, নিষিদ্ধ চরমপন্থী গোষ্ঠীর সদস্যরা জাতীয় সংসদ ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে। সকল ইউনিটকে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই নির্দেশনার পর পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে। ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার হারুন-অর-রশিদ জানান, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিয়মিত নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে প্রোটেকশন বিভাগ।
অভ্যন্তরীণ এই সতর্কবার্তায় নির্দিষ্ট কোনো সংগঠনের নাম উল্লেখ না থাকলেও নিষিদ্ধ ঘোষিত জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সন্দেহভাজন সদস্য ইশতিয়াক আহমেদ সামির গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ টানা হয়েছে। ইশতিয়াক আহমেদ সামি আবু বক্কর ও আবু মোহাম্মদ নামেও পরিচিত। পুলিশ জানায়, এই সন্দেহভাজন ব্যক্তি সেনাবাহিনীর দুই বহিষ্কৃত সদস্যের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।
শনিবার ডিএমপি সিটিটিসি-র যুগ্ম কমিশনার মুন্সী শাহাবুদ্দিন বলেন, দেশে জঙ্গি হামলার ঝুঁকি রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে কোনো একক সংগঠনের নাম শনাক্ত করা যায়নি।
শক্তি সঞ্চয় করছে জঙ্গিরা
জঙ্গি সংগঠনগুলো নতুন করে সক্রিয় হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এর আগে নিয়ন্ত্রণে আসা নেটওয়ার্কগুলো আবারও সংগঠিত হতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জঙ্গি সন্দেহে আটক বেশ কয়েকজন ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের কেউ কেউ জনসমাগমকে কাজে লাগিয়ে নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন এবং শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টা করছে।
তবে ওই সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন যে দেশে কোনো জঙ্গিবাদ নেই। ডিএমপি’র সাবেক কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী প্রকাশ্যেই বলেছিলেন দেশে কোনো জঙ্গি নেই। তার এমন বক্তব্য তখন বেশ সমালোচিত হয়েছিল।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এখন বলছেন, সম্ভবত সেই মূল্যায়নগুলোতে হুমকির মাত্রাকে কম করে দেখা হয়েছিল। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান বলেন, জঙ্গি তৎপরতা পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।
তিনি জানান, গত দুই থেকে চার বছর ধরে এই সমস্যাটি স্তিমিত থাকলেও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জঙ্গিবাদ দমনের সক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। দক্ষ জনবল এখন সঠিক জায়গায় নেই এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণও কমে গেছে।
তিনি আরও বলেন, জঙ্গিরা যে পুনরায় সংগঠিত হচ্ছে এবং কার্যক্রম শুরু করছে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নজরদারি জোরদার করা এখন জরুরি। ভারতে জঙ্গি তৎপরতার খবর বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ, কারণ এসব গোষ্ঠীর প্রায়ই আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা থাকে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সন্দেহভাজনদের খুঁজে বের করা একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ। সিটিটিসি’র তদন্ত বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবির জানান, একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
তিনি বলেন, একটি গ্রেপ্তারের সূত্র ধরে তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্যদেরও ধরা সম্ভব হয়। তারা অত্যন্ত সতর্ক এবং গোপনে কাজ করে। বর্তমানে বেশ কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বলেও জানান তিনি।
সিটিটিসি কর্মকর্তারা জানান, গত ২ এপ্রিল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হবিগঞ্জ সদর থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোর ইশতিয়াক আহমেদ সামি ওরফে আবু বক্করকে আটক করা হয়। শেরেবাংলা নগর থানায় দায়ের করা একটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলার আসামিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। ওই মামলার আসামিদের মধ্যে আহসান জহির খান, ড্যানিয়েল ইসলাম হাসান এবং রাসেল ওরফে পলাশ ওরফে আবু বাসের আল ফারুকী অন্যতম।
এ বছরের শুরুর দিকে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের এক সন্দেহভাজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ৩১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকার জিয়া উদ্যান লেকের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশ থেকে ৫০ বছর বয়সী আহসান জহির খানকে আটক করে সিটিটিসি।
সিটিটিসি কর্মকর্তাদের মতে, আহসান জহির নিষিদ্ধ জেএমবির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা একটি মামলাতেও তিনি অভিযুক্ত। গ্রেপ্তারের পর তাকে শেরেবাংলা নগর থানায় দায়ের করা পৃথক একটি মামলায় আদালতে হাজির করা হয়।
সিটিটিসি প্রধান মো. মাসুদ করিম জানান, আটক কিশোর সামিকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের নির্দেশে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। আগে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গি সদস্য ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় থাকার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
কর্মকর্তারা বলছেন, জেএমবিসহ নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো ছদ্মনামে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপ্টেড এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যোগাযোগ রক্ষা করছে। সিটিটিসি’র একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এই চ্যানেলগুলো উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচার এবং কার্যক্রম সমন্বয় করতে ব্যবহার হয়।
তদন্তকারীদের দাবি, আটক কিশোর সামি অনলাইনে ইসলামিক স্টেট (আইএস) সমর্থিত কন্টেন্ট শেয়ার এবং নতুন সদস্য সংগ্রহের চেষ্টা করত। এছাড়া বিস্ফোরক তৈরির পিডিএফ নির্দেশিকাও প্রচার করত। তার বিরুদ্ধে পুলিশ চেকপোস্ট, শিয়া মসজিদ এবং ইসকন মন্দিরে হামলার পরিকল্পনা ও উৎসাহ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
আন্তঃসীমান্ত সংযোগ
সম্প্রতি ভারতীয় পুলিশ নয়াদিল্লির উপকণ্ঠ থেকে লস্কর-ই-তৈয়বা (এলইটি) সদস্য সন্দেহে একজনকে গ্রেপ্তারের দাবি করেছে। দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল জানায়, শাব্বির আহমেদ ওরফে রাজা ওরফে কাশ্মীরি নামের এই সন্দেহভাজন জঙ্গি বাংলাদেশ থেকে ভারতে গিয়েছিলেন। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর নির্দেশে ভারতে বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করছিলেন বলেও অভিযোগ করেছে ভারতের পুলিশ। তাদের তদন্তকারীরা বলছেন, এই ঘটনাটি পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং নেপাল জুড়ে বিস্তৃত একটি আন্তঃসীমান্ত অর্থায়ন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।
সাম্প্রতিক কিছু উদ্বেগজনক ঘটনা
গত জানুয়ারিতে ফরিদপুরের আলিপুর ব্রিজের ওপর একটি স্কুল ব্যাগের ভেতর থেকে বোমা উদ্ধার করা হয়। রিমোট কন্ট্রোল চালিত সেই বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে পুলিশের অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিট।
২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকায় চেকপোস্ট তল্লাশির সময় এক পুলিশ সদস্য ছুরিকাহত হন। চারজন যুবকের কাছে একটি ব্যাগ দেখে সন্দেহ হলে তল্লাশির চেষ্টার সময় কনস্টেবল মো. শাহ আলম আক্রান্ত হন। পরে ওই ফেলে যাওয়া ব্যাগ থেকে একটি বোমা উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি বর্তমানে সিটিটিসি তদন্ত করছে।
১৫ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরবাগডাঙ্গা এলাকায় বিস্ফোরক তৈরির সময় এক বিস্ফোরণে জিহাদ আলী ও আল আমিন নামে দুইজন নিহত হন। এ ঘটনায় আরও তিনজন গুরুতর আহত হন এবং পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে।
এর আগে ৮ জানুয়ারি শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলায় একটি বাড়িতে বিস্ফোরণে সোহান বেপারী নামে এক যুবক নিহত ও দুইজন আহত হন। ওই বিস্ফোরণে বাড়ির একটি অংশ ধ্বংস হয়ে যায়।
২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে নারী ও শিশুসহ চারজন আহত হন। তদন্তকারীরা সেখান থেকে ইম্প্রোভাইজড ডিভাইস ও রাসায়নিকসহ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেন। মাদ্রাসার পরিচালক শেখ আল আমিন পলাতক রয়েছেন এবং মুফতি হারুন নামে আরেক সন্দেহভাজনকে খুঁজছে পুলিশ। এ ঘটনায় আহসান উল্লাহ নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এর কয়েকদিন পর ২৯ ডিসেম্বর ঢাকার মোহাম্মদপুরে মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানির বাসভবনের কাছে আরেকটি বিস্ফোরণ ঘটে। ৫ আগস্টের পর মুক্তি পাওয়া জসিম উদ্দিন রহমানি এর আগেও জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন।
যশোরে গত ৩১ জানুয়ারি এক যৌথ অভিযানে বাঘারপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ছিল বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন, গোলাবারুদ, গ্রেনেড সদৃশ বস্তু, ধারালো অস্ত্র এবং অত্যাধুনিক যোগাযোগ ও নজরদারির সরঞ্জাম।


