ভোটের পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে দাবি—৫০টির বেশি আসনে ৫ হাজারের কম ব্যবধানে হারানো হয়েছে জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীদের এবং ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে প্রকৃত ফল বদলে দেওয়া হয়েছে।
ফেসবুকের একাধিক পোস্টে বলা হয়, পিরোজপুর-২ আসনে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলে মাত্র ৭০ ভোটে পরাজিত হয়েছেন এবং খুলনায় মিয়া গোলাম পরোয়ার প্রায় ২ হাজার ভোটে হেরেছেন। আরও দাবি করা হয়, ৫৩টি আসনে ৫ হাজারের কম ব্যবধানে জামায়াত জোট পরাজিত হয়েছে এবং প্রকৃতপক্ষে তারা ১৩৫টি আসনে জয়ী হয়েছিল।
শুক্রবার ডিসমিসল্যাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অন্তত এক ডজন পোস্ট ও মন্তব্য বিশ্লেষণ করে। সংস্থাটি যাচাইয়ের জন্য প্রথম আলোর প্রকাশিত আসনভিত্তিক ফলাফল থেকে বিজয়ী ও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রাপ্ত ভোট সংগ্রহ করে ব্যবধান গণনা করা হয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৫ হাজার ভোটের কম ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে মোট ২২টি আসনে, ৫৩টিতে নয়। এসব আসনে ব্যবধান ৩৮৫ ভোট থেকে ৪ হাজার ৭০২ ভোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
এই ২২টি আসনের জোটভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জামায়াত ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ১১টিতে। বিএনপি ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ৯টিতে। একটি আসনে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং একটিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। অর্থাৎ স্বল্প ব্যবধানের আসনের অর্ধেকেই জয় পেয়েছেন জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীরা।
এই তালিকায় জামায়াত জোট সরাসরি পরাজিত হয়েছে ৯টি আসনে। পরাজিতদের মধ্যে রয়েছেন এনসিপির মো. আব্দুল আহাদ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ওমর ফারুক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা মামুনুল হক এবং জামায়াতে ইসলামীর ৬ জন প্রার্থী, যাদের মধ্যে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরোয়ারও রয়েছেন।
সবচেয়ে কম ব্যবধানের পাঁচটি আসনের মধ্যে মাদারীপুর-১ আসনে ব্যবধান ৩৮৫ ভোট এবং সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে ৫৯৪ ভোট। এই দুই আসনেই জয় পেয়েছেন জামায়াত বা তাদের মিত্র প্রার্থী।
অন্যদিকে, কক্সবাজার-৪, চট্টগ্রাম-১৪ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে যথাক্রমে ৯২৯, ১ হাজার ২৬ এবং ১ হাজার ৬১ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা।
স্বল্প ব্যবধানের আসনগুলোতে মোট ভোটের ব্যবধান যোগ করলে দেখা যায়, যেসব আসনে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা পরাজিত হয়েছে সেখানে মোট ব্যবধান ২৬ হাজার ৯০৭ ভোট, গড় পরাজয়ের ব্যবধান প্রায় ২ হাজার ৯৯০ ভোট। অন্যদিকে, বিএনপি ও তাদের মিত্ররা যেসব আসনে হেরেছে সেখানে মোট ব্যবধান ৩০ হাজার ৮২০ ভোট এবং গড় ব্যবধান প্রায় ২ হাজার ৫৬৮ ভোট।
ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ২৯৭টি আসনের ফল ভোটের ব্যবধান অনুযায়ী ছোট থেকে বড় ক্রমে সাজালে সবচেয়ে কম ব্যবধানের ৫০টি আসনের পরিসর ৩৮৫ থেকে ৯ হাজার ৫৮১ ভোট পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ৫০টি আসনের মধ্যে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ২৪টিতে, বিএনপি ও তাদের মিত্ররা ২২টিতে, তিনটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং একটিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জয়ী হয়েছে।
খুলনা-৫ আসন নিয়ে ভাইরাল পোস্টে যে দাবি করা হয়েছে, সেখানে প্রকৃত ব্যবধান ছিল ২ হাজার ৬০৮ ভোট। এটি ৫ হাজারের নিচে হলেও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত নির্দিষ্ট সংখ্যার সঙ্গে তা মেলে না।
পিরোজপুর-২ আসনে ৭০ ভোটে পরাজয়ের দাবিটিও সঠিক নয়। ওই আসনে ব্যবধান ছিল ৮ হাজার ২৮৮ ভোট। ফলাফল অনুযায়ী বিজয়ী আহম্মদ সোহেল মনজুর পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৫ ভোট এবং শামীম সাঈদী পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৮৯৭ ভোট।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্বল্প ব্যবধানের আসন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ৫৩টি আসনের দাবি পরিসংখ্যানগতভাবে সঠিক নয়। স্বল্প ব্যবধান উভয় জোটের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হয়েছে এবং তথ্য-উপাত্তে কোনো একক জোটের একচেটিয়া ক্ষতির প্রমাণ মেলেনি।


