৪০ বছরে আড়াই হাজার পুকুর ও জলাশয় হারিয়েছে চট্টগ্রাম

৪০ বছরে আড়াই হাজার পুকুর ও জলাশয় হারিয়েছে চট্টগ্রাম
ছবি: জাকির হোসেন/টাইমস
Advertisement
Advertisement

এক সময় চট্টগ্রাম শহরকে বলা হতো পুকুর, দিঘি ও খাল-নালার শহর। এখনো শহরের বহু এলাকার নাম এসব জলাশয়ের নামেই। তবে কালের গহ্বরে এসব জলাশয় ও পুকুরের বড় অংশই হারিয়ে গেছে।

গত চার দশকে দ্রুত নগরায়ন, আবাসন প্রকল্প ও বাণিজ্যিক উন্নয়নের কারণে চট্টগ্রামে প্রায় আড়াই হাজার পুকুর ও জলাশয় ভরাট করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এসব জলাশয় হারিয়ে যাওয়ায় শহরের তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে, জলাবদ্ধতা তীব্র হচ্ছে এবং অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জরিপের ১৯৮০-৮২ সালের তথ্য এবং ২০২৩ সালে পরিচালিত বিস্তারিত জরিপের ভিত্তিতে দেখা গেছে, গত ৪১ বছরে শহরের ৪১টি ওয়ার্ডে মোট দুই হাজার ৪৫৯টি পুকুর ও জলাশয় ভরাট করা হয়েছে।

বাংলাদেশ জরিপের পুরোনো নথি অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে চট্টগ্রামে মোট চার হাজার ৫৯৭টি পুকুর ও জলাশয় ছিল। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি পুকুর ও জলাশয়ই এখন আর নেই।

গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক পুকুর এখন আবাসিক ভবন, কারখানা, গ্যারেজ ও বাণিজ্যিক স্থাপনার নিচে হারিয়ে গেছে।

সবচেয়ে বেশি জলাশয় হারিয়েছে পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ড। এখানে থাকা ৩৭৮টি পুকুরের মধ্যে ২২৫টিই এখন আর নেই। উত্তর আগ্রাবাদে ২৮৫টি পুকুরের মধ্যে ২০৪টি ভরাট হয়ে গেছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান শুধু জলাশয় হারানোর নয়, বরং শহরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরছে।

পুকুর শুধু নামেই টিকে আছে

চট্টগ্রামের অনেক এলাকার নাম এখনো পুকুর বা দিঘির নামেই পরিচিত, যদিও বাস্তবে সেই জলাশয়গুলো আর নেই।

আরও পড়ুন

আন্দরকিল্লার রাজাপুকুর লেন তার একটি উদাহরণ। স্থানীয়দের মতে, সেখানে একসময় একটি বড় পুকুর ছিল, যা এখন সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। একইভাবে পশ্চিম মাদারবাড়ির মিচি পুকুর, রহমতগঞ্জের দেওয়ানজি পুকুর, বাহাদ্দারহাটের কমলদহ দিঘি ও ময়ল্লার দিঘিও হারিয়ে গেছে।

পুরোনো মানচিত্র ও স্থানীয় সূত্র বলছে, এসব জলাশয়ের অনেকগুলো এখন আবাসন প্রকল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ভবনের নিচে চাপা পড়ে গেছে।

ছবি: জাকির হোসেন/টাইমস

তাপমাত্রা বাড়ছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে পুকুর ও জলাশয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সবুজ এলাকা ও জলাশয় মিলেই শহরের তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় থাকে।

কিন্তু জলাশয় কমে যাওয়ায় চট্টগ্রাম ধীরে ধীরে “শহুরে তাপ দ্বীপে” পরিণত হচ্ছে, যেখানে আশপাশের এলাকার তুলনায় তাপমাত্রা বেশি অনুভূত হয়।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাশয় হারিয়ে যাওয়ায় শহরের প্রাকৃতিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে বেশি গরম অনুভব করছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে পাঁচ থেকে সাত ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম অনুভূত হয়।

এ ছাড়া পুকুর হারিয়ে যাওয়ায় শহর ব্যবস্থাপনাও জটিল হয়ে পড়ছে। আগে এসব জলাশয় ভারী বৃষ্টির পানি ধারণ করতে পারত। এখন সেগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত সড়ক ও নিচু এলাকায় জমে জলাবদ্ধতা বাড়াচ্ছে।

অগ্নিনির্বাপণ বিভাগও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, শহরে জনসংখ্যা ও ভবন বাড়লেও কাছাকাছি পানির উৎস কমে যাচ্ছে, ফলে বড় অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

আইন থাকলেও ভরাট বন্ধ হচ্ছে না

বাংলাদেশের জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০ অনুযায়ী পুকুর ও জলাশয় ভরাট নিষিদ্ধ। তবে বাস্তবে প্রভাবশালী ব্যক্তি, ডেভেলপার ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অনেক জলাশয় ভরাট করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ছবি: জাকির হোসেন/টাইমস

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, ১৫ কাঠার বেশি আয়তনের পুকুরে নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয় না। শহরের নতুন মাস্টারপ্ল্যানে জলাশয় সংরক্ষণকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন বাস্তবায়নে আরও কঠোরতা প্রয়োজন।

জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান

নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন থাকলেই হবে না, বিদ্যমান পুকুরগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো রক্ষা করতে হবে এবং অবৈধ দখলমুক্ত করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়গুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা জরুরি।

নগর ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ কাজী আশিকুর রহমান আরাফ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের পুকুর শুধু জলাশয় নয়, এটি শহরের প্রাকৃতিক অবকাঠামোর অংশ। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও দুর্বল নজরদারির কারণে অনেক পুকুর হারিয়ে গেছে। এতে তাপমাত্রা, জলাবদ্ধতা, ভূগর্ভস্থ পানির সংকট এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি বাড়ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সব জলাশয় ডিজিটালি ম্যাপিং করা জরুরি। অবৈধ ভরাট ও দখলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ পুকুরগুলোকে সংরক্ষিত জলাশয় ঘোষণা করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন পরিবেশ ও উন্নয়ন একসঙ্গে এগিয়ে যাবে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad