ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে চলমান ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে অনশন শুরু করা জনপ্রিয় অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করার অভিযোগ উঠেছে। ২৬ দিন পর শুক্রবার কেন্দ্র সরকারের মন্ত্রী জগৎ প্রকাশ নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার সামনে অনশন ভাঙায় এ অভিযোগ আনেন সমালোচকরা।
জবাবে ককরোচ জনতা পার্টি ও সমালোচকদের উদ্দেশে ভিতিও বার্তায় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে ওয়াংচুক বলেন, ‘২৬ দিন অনশন করার পরও কি আমাকে চারিত্রিক সনদ আর আন্তরিকতার প্রমাণ দিতে হবে?’
ইন্সটাগ্রামে সংক্ষিপ্ত ওই ভিডিও বার্তায় তিনি সবাইক নিজের ইউটিউব চ্যানেলে ২২ মিনিটের জবাবদিহিমূলক ভিডিও দেখায় আহ্বান জানান। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করলেও অনশন ভাঙার পেছনে কারণ ব্যখ্যা করে ওই বার্তা দেন তিনি।

হাসপাতালের শয্যা থেকে ধারণ করা ভিডিওতে সোনম ওয়াংচুককে দুর্বল দেখা যায়। দীর্ঘ অনশনের ফলে নিজের শারীরিক অবস্থার অবনতি এবং তা নিয়ে ওঠা সমালোচনার বিষয়ে নিজের অনুভূতি জানান তিনি। বলেন, ‘বন্ধুরা, আমি এই ভিডিওটি করছি কিছুটা দুঃখ, কিছুটা বিস্ময় এবং শোক ও ক্ষোভের মিশ্র অনুভূতি নিয়ে।’
‘শারীরিকভাবে লড়াই করা, ধস্তাধস্তি করা, আন্দোলনের মধ্যেই আরেকটি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া, ২০ বা ২২তম দিনে বসে থাকার শক্তি না থাকলেও মাটিতে শুয়েই অনশন চালিয়ে যাওয়া, আমার শরীরে যতটুকু শক্তি অবশিষ্ট ছিল তা দিয়ে আমাকে জোর করেই সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে।’
দীর্ঘ অনশনে শরীরের ওপর ভয়াবহভাবে প্রভাব পড়েছে জানিয়ে ওয়াংচুক বলেন, ‘আমার পেশিগুলো প্রায় শেষ হয়ে গেছে। আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও মস্তিষ্কের এমন ক্ষতি হয়েছে, যা স্থায়ী হয়ে যাওয়ার একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।’
লাদাখের এই অধিকারকর্মী জানান, অনশনকালে তিনি প্রায় ১১ কেজি ওজন হারিয়েছেন।
কেন্দ্র সরকার তার ও ককরোচ পার্টির দাবির বিষয়ে আলোচনার আশ্বাস দেওয়ার পর বৃহস্পতিবার রাতে তিনি অনশন শেষ করে প্রথমবারের মতো তরল খাবার গ্রহণ করেন। তবে কেন্দ্র সরকারের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অনশন ভাঙায় সমালোচনার মুখে পড়তে হয় ওয়াংচুককে।
এ বিষয়টিও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে উল্লেখ করে সোনম ওয়াংচুক বলেন, ‘আজ সকাল থেকেই অনেকেই আমাকে ফোন করছেন বা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখাচ্ছেন। সেখানে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, আপনি কেন তাদের হাত দিয়েই অনশন ভাঙলেন? অন্য কারও মাধ্যমে কেন নয়? কোনো সমঝোতা হয়েছে? কোনো গোপন চুক্তি হয়েছে?’
ক্ষোভ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন কি আমাকে কারও কাছ থেকে চরিত্রের সনদ নিতে হবে যে আমার অনশন কতটা নির্ভেজাল ছিল?’

সরকারের সঙ্গে গোপন রাজনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিতও তিনি সরাসরি নাকচ করে দেন।
ওয়াংচুক বলেন, ‘যদি কোনো সমঝোতা বা চুক্তিই করতে হতো, তাহলে কি ২৬ দিন না খেয়ে থাকতে হতো? আপনারা তো দেখেছেন, অন্যরা কীভাবে সমঝোতা করে। তারা কি এভাবে সমঝোতা করে? দিল্লির প্রচণ্ড গরমে রাস্তার ধারে বসে কেন সমঝোতা করতে হবে? বিলাসবহুল শীতাতপনিয়ন্ত্রিত একটি কক্ষে বসেই তো তা করা যেত।’
এ সময় দীর্ঘ আন্দোলনে তার পাশে থাকার জন্য হাজারও সমর্থককেও ধন্যবাদ জানান সোনম ওয়াংচুক।
অন্যদিকে, অনশন শেষ হলেও সিজেপির জাতীয় মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা শুক্রবার দিল্লির জন্তর মন্তরে আন্দোলনস্থলে সাংবাদিকদের জানান, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছাড়া তারা অন্য কোনো সমাধান মেনে নেবেন না।
সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ ঘোষণা এবং আলোচনায় অগ্রগতি সত্ত্বেও তাদের এই অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে বলে স্পষ্ট করেন তিনি।
একইসঙ্গে সোনম ওয়াংচুকের অনশন ভাঙার সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন আশুতোষ রাঙ্কা।
তিনি বলেন, ‘গত চার-পাঁচ দিন ধরে তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি হচ্ছিল। আমরা তাকে বারবার অনশন শেষ করার অনুরোধ করেছি। সরকারের কাছ থেকে কিছু প্রতিশ্রুতি ও আলোচনার অগ্রগতি নিশ্চিত করার পর তিনি অনশন শেষ করেছেন, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। তার আলোচনা ছিল অনশনকে ঘিরে, আর আমাদের আন্দোলন ও প্রতিবাদ চলমান রয়েছে। এই দুই বিষয়ে কোনো বিরোধ নেই।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্র সরকার জানিয়েছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলার বিচার দ্রুত শেষ করতে আইনি সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এ ধরনের মামলার জন্য দ্রুত বিচার আদালত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তবে আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, সরকারের এসব পদক্ষেপ স্বাগতযোগ্য হলেও এগুলো সংকটের মূল কারণের সমাধান করে না।


