রাজবাড়ীতে চলতি মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো বৃষ্টিপাত এবং কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যায় রাজবাড়ীর পাঁচ উপজেলাজুড়ে সোনালী আঁশের সমারোহ দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে জেলার মাঠগুলোতে কৃষকেরা পাট কাটা, জাগ দেওয়া এবং আঁশ ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে ফলন ভালো হলেও শেষ পর্যন্ত লাভের মুখ দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে কৃষকদের মন থেকে কাটছে না দুশ্চিন্তার মেঘ।
কৃষকদের অভিযোগ, সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় এবার উৎপাদন ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ফলে বাজারে পাটের কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে তাদের।
রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে জেলার পাঁচ উপজেলায় মোট ৪৭ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে।

কৃষি বিভাগের বিগত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাজবাড়ীতে পাটের আবাদ কম-বেশি হচ্ছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে জেলাটিতে ৪৭ হাজার ২৭৬ হেক্টর, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ৪৬ হাজার ১৫৮ হেক্টর, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ৪৯ হাজার ০৫০ হেক্টর এবং ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ৪৯ হাজার হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল।
সরেজমিন সদর, বালিয়াকান্দি, গোয়ালন্দ ও কালুখালী উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে দোল খাচ্ছে সবুজ পাট। কৃষকদের ব্যস্ততার যেন কমতি নেই।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের কৃষক মো. লতিফ শেখ (৪৫) বলেন, ‘এবার আল্লাহর রহমতে পাটের ফলন নিয়া কোনো কথা নাই, গাছ খুব চমৎকার হইছে। কিন্তু আমাগো আসল কপাল পুড়ছে কামলার (শ্রমিক) মজুরিতে। পাট কাটা আর ধোয়ার জন্য দৈনিক ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দিয়েও কামলা পাওয়া যাচ্ছে না। তার ওপর ডিজেল আর সারের দাম তো আকাশছোঁয়া। সব মিলায়া এবার এক বিঘা জমিতে যে খরচ হইছে, বাজারে পাটের মণ তিন হাজার টাকার নিচে হলে আমাগো ঘর থেকে টাকা দেওয়া লাগবে।’

গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের চরাঞ্চলের নারী চাষী জমিলা বেগম (৩৮) বলেন, ‘চরের মাটিতে এবার পাটের ফলন বেশ ভালো হইছে। পুরুষদের পাশাপাশি আমরা নারীরাও দিন-রাত এক করে আঁশ ছাড়ানোর কাজ করছি যাতে শ্রমিকের খরচ কিছুটা বাঁচানো যায়। কিন্তু চরাঞ্চল থেকে পাট যখন আমরা নৌকায় করে মূল বাজারে নিই, তখন ফরিয়া আর দালালেরা সিন্ডিকেট করে দাম কমায় দেয়। সরকার যদি সরাসরি আমাদের মতো ছোট চাষীদের কাছ থেকে পাট কিনত, তবেই আমরা বাঁচতাম।’
কালুখালী উপজেলার মদাপুর ইউনিয়নের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা আরিফুল ইসলাম (২৮) বলেন, ‘প্রথাগত চাষের বাইরে এসে এবার একটু আধুনিক উপায়ে পাটের আবাদ করেছিলাম, ফলনও বিঘাপ্রতি বেশ ভালো এসেছে। কিন্তু আমাদের মূল সমস্যা হলো কোনো স্থায়ী সরকারি ক্রয়কেন্দ্র না থাকা। বেসরকারি মিলগুলো তাদের ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করে। আমরা চাই কৃষি বিভাগ যেন শুধু ফলন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েই দায়িত্ব শেষ না করে, আমাদের উৎপাদিত সোনালী আঁশের সঠিক বিপণন ও ন্যায্য দাম পাওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করে।’
বালিয়াকান্দি উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের পাটচাষি মো. আকরাম আলী (৫২) বলেন, ‘এবার সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় পাটের আশাতীত ফলন হয়েছে, গাছও বেশ পুষ্ট। কিন্তু আমাদের মূল চিন্তা এখন বাজার নিয়ে। গত বছরের কিছু পাট এখনো ঘরে জমে আছে, তার ওপর এবার সার, বীজ আর জেনারেটরের পানি সেচ দিতে গিয়ে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এখন শুনছি বাজারে ব্যাপারীরা সিন্ডিকেট করার চেষ্টা করছে। সরকার যদি এখনই পাটের সরকারি মূল্য নির্ধারণ না করে দেয়, তবে আমাদের মতো ঋণগ্রস্ত কৃষকদের পথে বসতে হবে।’

রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা গোলাম রসূল জানান, গত বছর পাটের দাম ভালো থাকায় চলতি বছরে কৃষকেরা বেশি জমিতে পাট আবাদ করেছেন এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও অনুকূল তাপমাত্রার কারণে এবারও পাটের উৎপাদন ভালো হবে বলে আশাবাদী।
তবে বাজারের দামের ব্যাপারে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘দেশে কাঁচা পাটের ব্যবহার সীমিত। আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি না বাড়লে দেশের বাজারে কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে না। তাছাড়া গত বছরের অনেক পাট এখনও কৃষকদের ঘরে মজুত রয়েছে।’
তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, সাধারণত যে ফসলের দাম বেশি পাওয়া যায়, পরের বছর কৃষকেরা সেই ফসল বেশি আবাদ করেন। উৎপাদন খরচও যদি উঠে না আসে, তাহলে আগামী বছর পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক পাট উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তাই সোনালী আঁশের এই সুদিন ধরে রাখতে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি সাধারণ কৃষক ও সংশ্লিষ্ট মহলের।


