এক-এগারো নামে পরিচিত ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির রাজনৈতিক অস্থিরতা। সেদিন সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বন্দুকের নলের মুখে বানানো হয়েছিল সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সামনে বেসামরিক সরকারের খোলস থাকলেও সরকার পরিচালনায় ছিল সেনাবাহিনী। এখন সেই সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা ও সরকার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সামরিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। ওই সময়ের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে বিএনপি সরকারের কঠোর অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
একটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে, প্রায় ১৮ বছর পর ক্ষমতায় ফেরার পর, বিএনপি সরকার কি এবার ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার সঙ্গে জড়িত বেসামরিক নেতাদের মধ্যে অন্যতম অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত করবে?
২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রাজনৈতিক পরিণতি জিয়া পরিবার ও বিএনপির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। এই উত্তাল সময়ে, মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল, যিনি এক-এগারো তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
সাবেক সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা টাইমস অব বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছেন, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সামরিক নেতৃত্ব ইউনূসকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে, ইউনূস স্বল্পকালীন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তার নেতৃত্বে দীর্ঘ সময়ের সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি ফখরুদ্দীন আহমদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা সামরিক নেতৃত্ব পরবর্তীতে গ্রহণ করে।
ওই সময়ে, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্মকর্তারা–সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ, পিএসও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, ডিএফজিআই প্রধান মেজর জেনারেল সৈয়দ ফাতেমি আহমেদ রুমি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারি এবং এটিএম আমিনসহ মুহাম্মদ ইউনূস এবং উল্লেখযোগ্য বেসামরিক নেতারা, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিসরের বাইরে জিয়া ও শেখ পরিবারকে সরানোর পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন। ‘কিংস পার্টি’ তৈরি করে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার তাদের পরিকল্পনা ছিল। এই প্রক্রিয়া ‘মাইনাস টু’ ফরমুলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।
‘মাইনাস টু’ ফরমুলাটি বাস্তবায়নের জন্য ডিএফজিআই দু’টি ইউনিট-কাউন্টার ইনটেলিজেন্স ব্যুরো (সিআইবি) এবং কাউন্টার টেরোরিজম ও ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর (সিটিআইবি) মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়েছিল। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারি সিআইবির নেতৃত্বে ছিলেন, আর সিটিআইবির নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিন।
ব্রিগেডিয়ার আমিনের নেতৃত্বে সিটিআইবি রাজনৈতিক নেতাদের এবং ব্যবসায়ীদের অপহরণ ও নির্যাতন করেছিল, যার ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একাধিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়। বিএনপি নেতা ও বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
বর্তমানে বিদেশে অবস্থানকারী একাধিক সাবেক কর্মকর্তা টাইমসকে নিশ্চিত করেন, ইউনূস পশ্চিমা সমর্থনে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের দিকে এগিয়েছিলেন। এ সময়ে তিনি সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদের সমর্থন পেয়েছিলেন। যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে মঈন নিজেই সরকার প্রধান হতে চান, তখন ইউনূস সরে যান।
মঈন পরে ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর মাধ্যমে আরেকটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেন। পরিকল্পনা ছিল, একবার ‘মাইনাস টু’ পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে মঈন এই দলটির সঙ্গে যুক্ত হবেন। তবে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির তৃণমূলে প্রতিরোধের মুখে ‘মাইনাস টু’ প্রকল্প ব্যর্থ হয়। সামরিক এবং বেসামরিক নেতারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘সেফ এক্সিট’ নিয়ে আলোচনা করতে বাধ্য হন।
২০০৭ সালে ইউনূস ক্ষমতায় আসার সুযোগ হারালেও ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন পরবর্তী রাজনৈতিক দৃশ্যপটে তিনি আবারও দেশের নেতৃত্ব নেওয়ার সুযোগ পান। তবে, তার অবস্থান অপরিবর্তিত থাকে–শুরুতে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের ভূমিকা নিতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। তবে, সূত্র নিশ্চিত করেছে, তিনি শেষ পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি সরকারের শর্তে কাজ নিতে রাজি হন।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর এমন কথা রটানো হয় যে, ইউনূস প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিতে চাননি। তবে, রাজনৈতিক এবং সামরিক সূত্রের মতে, ৮ আগস্ট শপথ নেওয়ার আগেই ইউনূস নিশ্চিত হয়েছিলেন তিনি পরবর্তী সরকার প্রধান হবেন।
প্যারিসে অবস্থানকালে, ইউনূস তার সরকারের উপদেষ্টাদের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছিলেন। তিনি জুলাই-আগস্টে সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন, যা তার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে আরও শক্তিশালী করেছিল।
মুহাম্মদ ইউনূসকে অনেকেই তার উদ্যোক্তা সফলতার জন্য সম্মানিত ব্যক্তি মনে করেন। তবে তার রাজনৈতিক যাত্রা ছিল বিতর্কিত। তার ক্ষমতার প্রভাব ধরে রাখার প্রচেষ্টা দুইবারই ব্যর্থ হয়েছে।
পশ্চিমা সমর্থন পেয়েও তার রাজনৈতিক ব্যর্থতাগুলোর পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। এসবের মধ্যে আছে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির অভাব, জাতীয় কল্যাণের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণে অপরিণত মনোভাব। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব দুর্বলতা ইউনূসের রাজনৈতিক ক্ষমতা স্থায়ী করতে ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ।


