জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু শহীদদের পরিবারের কাছে সময় যেন সেখানেই থমকে আছে। কারও ঘরের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলে আর ফেরেনি, কোথাও প্রতিদিন পরিষ্কার করা হয় সন্তানের কবর, আবার কোনো মা এখনো বিশ্বাস করতে পারেন না–যে ছেলে একদিন সকালে বের হয়েছিল, সে আর কোনো দিন ফিরবে না। বিচার পাওয়ার অপেক্ষাও শেষ হয়নি তাদের।
দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় ছিলেন মোহাম্মদ সজীব। অভাবের সংসারে বাবার কাঁধের বোঝা কমাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় একটি রঙের দোকানে চাকরি নিয়েছিলেন। এক বছর তিন মাস ধরে বাড়ি ফেরেননি। ঈদেও না। কথা ছিল, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু সেই ফেরা আর হয়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সাইনবোর্ড এলাকায় সড়ক পার হওয়ার সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। দুই বছর পরও ছেলে হারানোর সেই শোক আর বিচার না পাওয়ার অপেক্ষা বয়ে বেড়াচ্ছেন তার বাবা অটোরিকশাচালক মো. সালাউদ্দিন।
অশ্রুসজল কণ্ঠে সালাউদ্দিন বলেন, জীবিকার তাগিদে ঢাকায় চাকরি করছিল সজীব। কোরবানি বা রমজানের ঈদেও বাড়ি আসেনি। বলেছিল জুলাই মাসে ছুটিতে ফিরবে। কিন্তু ছুটি নিয়ে ছেলে আর জীবিত ফেরেনি, ফিরেছে তার মরদেহ। এখন কেউ কবর জিয়ারত করতে এলে কবরের সামনে থেকে সরে আসতে পারেন না তিনি।
নোয়াখালীর সদর উপজেলায় প্রতিদিন ছেলের কবর পরিষ্কার করেন মো. মোজাম্মেল হোসেন। কবরের মাটি ছুঁলেই যেন ফিরে আসে একমাত্র ছেলে রায়হানের স্মৃতি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিজয় মিছিলে অংশ নিতে রাজধানীর বাড্ডায় গিয়েছিলেন ঢাকা কমার্স কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রায়হান। সেখানে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। দুই বছর পরও সেই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি পরিবার।
রায়হানের বাবা মো. মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘এ পর্যন্ত আসলে আমরা মনরে বুঝাইতে পারি নাই। রায়হান যে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আমাদের ঘর অন্ধকার। একমাত্র ছেলে হারাই আমরা এখন অসহায় অবস্থায় আছি।’
ছেলের কথা উঠতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মা আমেনা খাতুনও। তিনি বলেন, ‘আজ দুই বছর হইছে, আমার সন্তান আমারে আর বোলে না। ৫ আগস্ট আসতেছে, কিন্তু আমার ছেলে আসে নাই।’
শুধু রায়হানই নন, একই দিনে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানার সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মোহাম্মদ ইয়াসিন ও হাসান। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানদের হারিয়ে আজও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের স্বজনদের।
হাসানের মা বলেন, ‘আমার হাসান সোনাইমুড়ী বাজারে আম বিক্রি করতে সকালে গেছে। সাড়ে ১০টা বাজছে আমার ছেলে মারা গেছে… আমি থানার সামনে গেছি, কেউ বলে না আমার ছেলে তো মারা গেছে।’
জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আরিফ হোসেন বলেন, সরকার দ্রুত হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার সম্পন্ন করুক, যাতে শহীদদের বাবা-মায়েরা জীবদ্দশায় সেই বিচার দেখে যেতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি জুলাই সনদ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান।
নোয়াখালী নাগরিক উন্নয়ন ফোরামের আহ্বায়ক এস এম সাহাব উদ্দিন বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় জেলার শহীদ পরিবারগুলোর যে শূন্যতা তিনি কাছ থেকে দেখেছেন, সেটি তাদের পাশে দাঁড়ানোর প্রেরণা। তিনি জুলাই হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার, শহীদদের রাষ্ট্রীয় সম্মান ও পূর্ণাঙ্গ গেজেট প্রকাশ এবং উপার্জনক্ষম সদস্য হারানো পরিবারগুলোর জন্য টেকসই রাষ্ট্রীয় সহায়তার দাবি জানান।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নোয়াখালী জেলার ২৬ জন দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণ হারান এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হন। দুই বছর পরও স্বজনহারা পরিবারগুলোর প্রত্যাশা–প্রিয়জনের আত্মত্যাগের বিচার ও স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে একদিন হয়তো তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার কিছুটা অবসান হবে।


