হামে আক্রান্ত পাঁচ বছর বয়সী ওমর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় শুয়ে রয়েছে। তাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন বাবা বাবা কামরুল হাসান তার বেডের পাশে বসে আছেন।
ডায়রিয়া নিয়ে শিশুটিকে প্রথমে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছিল। তিন দিনের চিকিৎসায় অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও পরে তার জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। এরপর চিকিৎসকরা তাকে হাম ওয়ার্ডে স্থানান্তর করেন।
শিশুটির বাবা কামরুল হাসান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা ওমরকে টিকা দিইনি। আমরা ভেবেছিলাম হাম সাধারণ একটি রোগ, তাই টিকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’
হাসপাতালগুলোতে হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে এমন দৃশ্য এখন সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম ও এর জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অনেক শিশুই টিকা নেয়নি।

টাইমস অব বাংলাদেশ ঢাকার দুটি হাসপাতালে ভর্তি ৩৩ শিশুর অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেছে। এর মধ্যে ১৬ জন জানিয়েছেন, তাদের সন্তান হামের টিকা নিয়েছে। এদের মধ্যে ছয়জন চলমান বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতেও অতিরিক্ত ডোজ পেয়েছে।
অন্যদিকে ১৭ জন অভিভাবক বলেছেন, তাদের সন্তান কোনো হামের টিকাই নেয়নি।
শুক্রবার পর্যন্ত হাম ও হাম-সংশ্লিষ্ট জটিলতায় মৃত্যুর সংখ্যা ৪৫১ জনে পৌঁছানোয় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে ভর্তি অনেক শিশুই হামের টিকা নেয়নি। ওমরের বাবার মতো কিছু অভিভাবক রোগটিকে তেমন গুরুতর মনে করেননি। আবার কেউ কেউ অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া টিকাবিরোধী প্রচারণায় প্রভাবিত হয়েছেন। এ ছাড়া অতিরিক্ত ভিড় বা অন্য জটিলতার কারণেও অনেকে সন্তানকে টিকা দিতে পারেননি।
ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে।
ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা ডিসমিসল্যাব সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সরকার হাম প্রতিরোধে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করেছে। এর পরও ফেসবুকে টিকাবিরোধী পোস্ট ছড়ানো অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু পোস্টে টিকার পরিবর্তে তথাকথিত বিকল্প পদ্ধতির প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ধর্মীয় চিকিৎসা, আয়ুর্বেদিক পদ্ধতি, এমনকি শরীরে লালা মাখানোর মতো অদ্ভুত পরামর্শও।
ডিসমিসল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ মার্চ থেকে ১ এপ্রিলের মধ্যে অন্তত ৭৮টি টিকাবিরোধী ফেসবুক পোস্ট ছড়ানো হয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, এসব পোস্ট মূলত তিন ধরনের ভুয়া বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল এবং বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে বারবার শেয়ার করা হচ্ছিল।
কিছু পোস্টে মিথ্যাভাবে দাবি করা হয়, টিকাদান কর্মসূচি একটি “শয়তানি পরিকল্পনার” অংশ এবং টিকার মাধ্যমে মানুষের ওপর চিকিৎসা পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।
১৯ বছর বয়সী মিম আক্তার ৫ মে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোড থেকে তার তিন বছর পাঁচ মাস বয়সী ছেলে সোহানকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন। মিম বলেন, সোহান নয় মাস বয়সে হামের টিকা পেয়েছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে তাকে অতিরিক্ত ডোজ দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, “ও তো আগেই টিকা নিয়েছিল। শুনেছিলাম অতিরিক্ত ডোজ দিলে বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে যেতে পারে, তাই ভয় পেয়েছিলাম।”
একই হাসপাতালে নোয়াখালী থেকে আসা ১১ বছর বয়সী এক শিশুর মা বলেন, তার সন্তান কখনো হামের টিকা নেয়নি, কারণ তিনি জানতেনই না যে এই টিকা দেওয়া প্রয়োজন।
এমনকি কিছু স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যেও টিকা নিয়ে সন্দেহ দেখা গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক নার্স জানান, তিনি তার নিজের দুই সন্তানকেও হামের টিকা দেননি।
কেন দেননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি নিজেই যদি একজন নার্স হয়ে মনে করি এটি সুরক্ষা দিচ্ছে না, তাহলে সাধারণ মানুষ কেন বিশ্বাস করবে?”

হাসপাতালের শিশু বিভাগে কর্মরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে।
চিকিৎসক তানজিলা হক টাইমসকে বলেন, “আক্রান্ত কিছু শিশু নিয়মিত টিকা ও ক্যাম্পেইনের অতিরিক্ত ডোজ—দুটিই পেয়েছিল। আবার অনেক শিশু কোনো টিকাই নেয়নি।”
তবে টিকা না নেওয়ার কারণ সবার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস নয়, অনেকের জন্য সমস্যা ছিল টিকা পাওয়ার সুযোগ। গাজীপুরের পোশাকশ্রমিক রোকসানা বেগম বলেন, তিনি এখনো তার চার বছর বয়সী ছেলে মোস্তাকিমকে হামের টিকা দিতে পারেননি।
তিনি বলেন, “ছেলেকে টিকা দিতে ছুটির দিনে ক্যাম্পেইন কেন্দ্রে গিয়েছিলাম। কিন্তু এত ভিড় ছিল যে আমার সিরিয়াল আসতে আসতে বিকাল ৪টা বেজে যায়। তখন তারা বলল, সেদিন আর টিকা দেওয়া হবে না, পরের দিন আসতে হবে। কিন্তু আমার কাজ ছিল, তাই আর যেতে পারিনি।”
হামে মৃতের সংখ্যা ৪৫০ ছাড়াল
হাসপাতালগুলোর এই পরিস্থিতি গত দুই মাসে সারা দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া হামের চিত্রই তুলে ধরছে।
ডিজিএইচএসের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত দুই মাসে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে মোট ৪৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এর মধ্যে হামে নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে ৭৪ জনের। বাকি ৩৭৭ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার ৬১১ জনে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৪১৬ জন নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত করা হয়েছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ১৯২ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং আরও ১১১ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।
একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ১৬ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন, আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৮৭ জন।


