গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট রোডে গুলিবিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। পাশের একটি চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে অটোরিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করা হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে নেওয়া হয় এভারকেয়ার হাসপাতালে। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ১৫ ডিসেম্বর হাদিকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে মারা যান ওসমান হাদি।
এরপর ১৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় তার মরদেহ দেশে আনা হয়। পরদিন ২০ ডিসেম্বর মরদেহের সুরতহাল শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে হাদিকে সমাহিত করা হয়।
তার হত্যার ঘটনায় আসামিদের বিচারের দাবিতে রোববার সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে ইনকিলাব মঞ্চ।

সিলেট
নিহত শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে সিলেটে সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ করেছেন ইনকিলাব মঞ্চ ও শিক্ষার্থীরা।
রোববার দুপুর ২টার দিকে নগরের চৌহাট্টা পয়েন্টে ইনকিলাব মঞ্চ সিলেট জেলা শাখা ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) শাখার নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণে এ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
আন্দোলনকারীরা নগরীর চৌহাট্টা এলাকা সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ করেন। আন্দোলনকারীরা রাস্তায় বসে স্লোগান, বিদ্রোহী কবিতা এবং সংগীতের মাধ্যমে তাদের দাবি জানিয়েছেন। আন্দোলনকারীদের হাতে ‘জাস্টিস ফর হাদি’ লেখা প্লে-কার্ড এবং হাদির ছবি দেখা গেছে।
আন্দোলনকারীরা জানান, শরিফ ওসমান হাদি হত্যার ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্রপক্ষ কোনো দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি।
তারা অভিযোগ করেন বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সহায়তায় খুনিকে ভারতে পালিয়ে যেতে সাহায্য করা হয়েছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।
আন্দোলনকারীরা উপদেষ্টাদের পদত্যাগ দাবি করে বলেন, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং আইন উপদেষ্টা দায়িত্ব পালনে বারবার ব্যর্থ হয়েছেন। যদি তারা বিচার নিশ্চিত করতে না পারেন, তবে তাদের পদত্যাগ করা উচিত।
এদিকে, সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভের কারণে যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষজন। ওই সময় বিক্ষোভকারীরা তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ না ছাড়ার ঘোষণা দেন।

রংপুর
হাদির হত্যাকারী, পরিকল্পনাকারী এবং কুশিলবদের গ্রেপ্তার করে এক মাসের মধ্যে বিচারের মুখোমুখি না করা পর্যন্ত মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে রংপুরের ইনকিলাব মঞ্চ।
রোববার বিকাল ৩টা থেকে নগরীর ডিসির মোড়ে অবস্থা নিয়ে বিক্ষোভ করেন ইনকিলাব মঞ্চ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা ও মহানগর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরাসহ শিক্ষার্থীরা।
এ সময় ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’; ‘হাদিভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’; ‘আমরা সবাই হাদি হবো’; ‘যুগে যুগে লড়ে যাবো’; ‘তুমি কে আমি কে, হাদি হাদি’সহ নানা শ্লোগান দেওয়া হয়।
অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন- জাতীয় ছাত্র শক্তির মহানগর আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মহাননগর মুখপাত্র নাহিদ হাসান খন্দকার প্রমুখ।
তারা বলেন, গত ১৬ দিনেও হাদি হত্যার কোন কুল-কিনারা করতে পারেনি ইন্টিরিম সরকার। এ বিষয়ে স্পস্ট সুরাহা না করা পর্যন্ত ছাত্র-জনতা মাঠে থাকবে। প্রয়োজনে সারা বাংলাদেশ থেকে গিয়ে যমুনা ঘেরাও করা হবে।

ঝালকাঠি
ওসমান হাদি খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে তার জন্মস্থান ঝালকাঠির নলছিটিতে মহাসড়ক ব্লকেড করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন সাধারণ ছাত্র জনতা।
দুপুর সাড়ে ৩টায় বরিশাল কুয়াকাটা মহাসড়কের দপদপিয়া জিরো পয়েন্ট এলাকায় বিক্ষোভ শুরু করেন ছাত্রজনতা। পরে তারা মুহুমুহু স্লোগান দিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় মহাসড়কে ব্যারিকেড দিয়ে যানবাহনের গতিরোধ করেন তারা।
অবরোধের কারণে বরিশাল ও ঢাকাগামী রুটের দূরপাল্লার বাসসহ বিভিন্ন পরিবহনের শতাধিক যানবাহন আটকা পড়ে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।
অবরোধকারীরা জানান, হাদি হত্যার এতদিন পর খুনি ভারতে পালিয়ে যাবার তথ্য জানানো হল। এটি নি:সন্দেহ পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়সাড়া ভূমিকা এবং উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত।
হাদির হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে না পারলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করার হুঁশিয়ারি দেন তারা।
অবরোধকারীদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- আহত জুলাই যোদ্ধা মিন্টু হাওলাদার, শিক্ষার্থী সাথী আক্তার, সমাজকর্মী বালী তাইফুর রহমান তুর্য প্রমুখ।
নারায়ণগঞ্জ
রোববার দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে হাদি হত্যা মামলার দ্রুত বিচার করার দাবিতে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা।
বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন তারা। এ সময় আসামিদের গ্রেপ্তার করে বিচার সম্পন্ন করার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন অবরোধকারীরা।
ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের ঢাকামুখী এক সাইটের তিন লেন অবরোধ করে রাখায় বিপুল সংখ্যক যানবাহন আটকে যায়। এতে যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বার্হী কর্মকর্তা এস এম ফয়েজ উদ্দিন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী ঘটনাস্থলে গিয়ে আন্দোলনকারীদের জানান, সরকারে উচ্চ পর্যায় থেকে এরই মধ্যে আশ্বস্ত করা হয়েছে দ্রুত বিচার করা হবে।
প্রশাসনের এমন আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে বিক্ষোভকারীরা সড়ক থেকে অবরোধ তুলে নেয়। পরে যান চলাচল শুরু হয়।

রাজশাহী
হাদির হত্যার সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্রধান ফটকের সামনে মহাসড়ক অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ করছেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা।
রোববার দুপুর আড়াইটার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটের সামনে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়ক অবরোধ করে এ কর্মসূচি শুরু করা হয়।
এক পর্যায়ে ১৫ থেকে ২০ জন বিক্ষোভকারী মহাসড়কের ওপর অবস্থান নিয়ে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে দেন। পরে তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন।
বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করে বলেন, শরিফ ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক বা বিচারিক অগ্রগতি নেই। এতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় না আনা হলে আন্দোলন আরও কঠোর করা হবে।
এ দিকে, মহাসড়ক অবরোধের কারণে রাজশাহী-নাটোর সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাদের।
অপরদিকে, একই দাবিতে নগরীর তালাইমারী এলাকাতেও মহাসড়ক অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন জুলাই যোদ্ধা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীরা।
আন্দোলনকারীরা জানান, ইনকিলাব মঞ্চের কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে তারা সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ করে অবস্থান করেন।

কক্সবাজার
হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে কক্সবাজারে সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে ছাত্র-জনতা।
বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে শহরের প্রবেশমুখ বাসটার্মিনাল এলাকায় ‘কক্সবাজারের ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে প্রায় দুই শতাধিক বিক্ষোভকারী সড়কে বসে অবস্থান নেন। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের উভয়পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কক্সবাজার জেলা শাখার সদস্য সচিব ওমর ফারুক।
তিনি বলেন, ‘হাদির ওপর হামলার ঘটনার ১৫ দিন পার হলেও এখনো বিচারের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এ নীরবতা মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে বিচার কার্যক্রম শুরু করতে হবে।’
অবরোধ কর্মসূচিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় কক্সবাজারের সমন্বয়ক ও ছাত্র প্রতিনিধিরাও কর্মসূচিতে অংশ নেন।
ছাত্রনেতা এস এ সাগর বলেন, ‘ওসমান হাদি ছিলেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম অগ্রনায়ক। তিনি ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সাহসী কণ্ঠ ছিলেন। তার হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ব না। সরকারকে দ্রুত ও স্পষ্ট জবাব দিতে হবে।’


