বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশে চলছে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক। এই শোকের মধ্যে পুরনো বছরের শেষ দিন ও নতুন বছরের প্রথম দিন উদযাপনে প্রকাশ্যে কোনো ধরনের আতশবাজি পোড়ানো, পটকা ফোটানো, ডিজে পার্টির মতো আয়োজনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
অবশ্য নতুন বছরের শেষ ও প্রথম প্রহরে আতশবাজি, পটকা ফোটানো এবং ফানুস উড়ানো বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের নির্দেশ রয়েছে।
এসব বন্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশের মহাপরিদর্শক ও ডিএমপি কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি আদেশ বাস্তবায়ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনও করতে বলা হয়।
গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর এক রিটের শুনানি নিয়ে বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন এবং বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এই আদেশ দেয়।
বর্ষবরণের নামে আতশবাজি ও পটকা ফুটিয়ে, ফানুস উড়িয়ে শব্দ ও বায়ুদূষণের মাধ্যমে জনজীবন অতিষ্ঠ হওয়ার প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আশরাফ-উজ-জামান হাইকোর্টে এই রিট করেছিলেন।
রিটে স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের আইজি ও ডিএমপি কমিশনারকে বিবাদী করা হয়।
এছাড়া, বর্ষবরণের নামে আতশবাজি ও পটকা ফোটানো এবং ফানুস উড়ানো বন্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশের আইজি ও ডিএমপি কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে আইজিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
সেই আদেশের অগ্রগতি জানতে কথা হয় আশরাফ-উজ-জামানের সঙ্গে।
তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, ওই আদেশের পরে বিবাদীরা কিছু বাস্তবায়ন করেছেন, কিছু পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি।
এই আইনজীবী বলেন, ‘এবারও যেন বর্ষবরণের ক্ষেত্রে শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ সৃষ্টি করে মানুষের জীবন বিপন্ন করা না হয়, সেটি বন্ধে হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জনগণকেও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে, কারণ এর ফলে মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি হয়। বিভিন্ন সময় অনেকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।’
এদিকে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় নববর্ষ উপলক্ষ্যে আতশবাজি, লণ্ঠন এবং পটকা ফোটানো পরিহার করতে সবাইকে অনুরোধ করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
মঙ্গলবার মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে এই আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষ্যে আতশবাজি, ফানুস ওড়ানো এবং পটকা ফোটানোর ফলে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, অগ্নিকাণ্ড ও পাখির মৃত্যু ঘটায়।
এত সব সতর্কবাণী আর নিষেধাজ্ঞার পরও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে থার্টি ফার্স্ট নাইট উপলক্ষে প্রকাশ্যে কোনো আয়োজন হয় কিনা এটাই এখন দেখার বিষয়।
সাধারণ ও সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, প্রশাসন কঠোর হলেই এসব নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন সম্ভব। সেই সঙ্গে মানুষের মধ্যেও বিবেচনাবোধ তৈরি হওয়া জরুরি।
ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মাহবুব হক বলেন, প্রতিবছরই ছাদে ছাদে আতিশবাজি পোড়ানোর উৎসব চলে, বাজির তীব্র শব্দে আতংকিত হয়ে পড়ে শিশুরা। বিশেষ করে বিহারী ক্যাম্প রয়েছে যেসব এলাকায় সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে চলে এসব।
তিনি মনে করেন, কেবল পুলিশকে শক্ত হলেই চলবে না। মানুষের মধ্যেও বোধ আসতে হবে। তাহলেই এসব বন্ধ করা সম্ভব।
ধানমন্ডির শিক্ষার্থী রায়না সুলতানা মনে করেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকের মধ্যে এবার হয়ত অন্যবারের মতো পরিস্থিতি হবে না। তবে পুরোপুরি আতশবাজি পোড়ানো বা বাজি ফোটানো বন্ধ থাকবে বলে মনে করেন না তিনি।
তার মতে, দেশের সব মানুষ সমানভাবে যেমন শোক ধারণ করেন না তেমনি সবার মধ্যে নিয়ম-আইন মেনে চলার প্রবণতাও নেই। ফলে তিনি খুব অন্যরকম কিছু আশা করতে পারছেন না।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে চলমান রাষ্ট্রীয় শোকের সময়ে ঢাকা মহানগর এলাকায় সব ধরনের আতশবাজি, পটকা ফোটানো, ফানুস ও গ্যাস বেলুন ওড়ানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ডিএমপি। ডিএমপির গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উন্মুক্ত স্থানে কোনো ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ডিজে পার্টি, শোভাযাত্রা আয়োজন করা যাবে না। এছাড়া উচ্চ শব্দে গাড়ির হর্ন বাজানো বা গণ-উপদ্রব সৃষ্টি করে—এমন কোনো কর্মকাণ্ড থেকেও বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
খ্রিষ্ট্রীয় নববর্ষের রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আতশবাজির শব্দে ভয় পেয়ে অসুস্থ হয়ে তানজিম উমায়ের নামে এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে।
জন্ম থেকেই হৃদরোগে ভুগতে থাকা শিশুটি চার মাস ১৯ দিন বয়সী শিশুটি ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাতে আতশবাজির শব্দে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরদিন ১ জানুয়ারি তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
ওই শিশুর মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে গত বছর থার্টি ফার্স্ট নাইটে আতশবাজি ও পটকা ফোটানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
শনিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় জানায়, অতিরিক্ত শব্দের কারণে শ্রবণশক্তি ও স্মরণশক্তি হ্রাস, ঘুমের ব্যাঘাত, দুশ্চিন্তা, উগ্রতা, উচ্চ রক্তচাপ, মাথা ঘোরা, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়া, মানসিক অস্থিরতা, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়াসহ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে।
তবে এরপরও থার্টি ফার্স্ট নাইটে ওই বছর শব্দদূষণ বন্ধ হয়নি। পরের বছরগুলোতেও দেখা গেছে বাড়ি ফোটানো, আতশবাজি পোড়ানো আর ডিজে পার্টির মতো আয়োজন।
গত বছর বর্ষবরণের রাতে শুধু ঢাকা শহরে চার প্রজাতির শতাধিক পাখির মৃত্যু হয়। আর কমপক্ষে চার প্রজাতির পাখি ভয় ও আতঙ্কে বাসা ছেড়ে উড়ে গেছে। বেশ কিছু এলাকায় পাখিরা অসুস্থ হয়ে পড়ে, বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তথ্য এসেছে।
শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬-এর ৭ বিধি লঙ্ঘন করে অনুমোদনহীনভাবে থার্টি ফার্স্ট নাইট উদ্যাপনের সময় আতশবাজি ও পটকা ফোটালে তা বিধিমালার ১৮ বিধি অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য।
এই আইন লঙ্ঘন করলে প্রথম অপরাধের জন্য অনধিক এক মাস কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য অনধিক ৬ মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড প্রদানের বিধান রয়েছে।


