হলিউডের শহরে ফুটবলীয় থ্রিলার উপহার দিল ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া

হলিউডের শহরে ফুটবলীয় থ্রিলার উপহার দিল ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া
গোল করার পর উদযাপন করেন হ্যারি কেইন। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ডালাস হলিউডের অনেক ‘থ্রিলার’ সিনেমার শুটিং-স্পট। সেখানে ডালাস স্টেডিয়ামে রীতিমতো ফুটবলীয় থ্রিলার উপহার দিল ইংল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়া। আর সেই রুদ্ধশ্বাস থ্রিলারের আসল ‘নায়ক’ জোড়া গোল করা ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি কেইন। প্রথমার্ধে দুবার এগিয়ে গিয়েও ক্রোয়েশিয়ার চোয়ালবদ্ধ লড়াইয়ে দুবারই গোল শোধের ধাক্কা খেতে হয়েছিল ইংল্যান্ডকে। তবে বিরতির পর আর পারেনি ক্রোয়াটরা। এই অর্ধে আরও দুই গোল করে ৪-২ ব্যবধানের দুর্দান্ত জয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করল টমাস টুখেলের শিষ্যরা।

মাঠের লড়াইয়ে গতি, বল নিয়ন্ত্রণ আর নিখুঁত পাসিংয়ে জুড বেলিংহাম ও ননি মাদুয়েকেদের সামনে মাঝমাঠ, আক্রমণ কিংবা রক্ষণ–কোনো বিভাগেই শেষ পর্যন্ত পাল্লা দিয়ে উঠতে পারেনি ক্রোয়েশিয়া। প্রথমার্ধে কেইনদের চোখে চোখ রেখে ক্রোয়াটরা লড়লেও বিরতির পর ধীরে ধীরে ধার কমেছে তাদের আক্রমণের। দুই দলই বক্সের জটলার ভেতর থেকে আরও বেশ কিছু সুযোগ পেয়েছিল, তবে কখনো গোলকিপারের অবিশ্বাস্য দক্ষতা, আবার কখনো ডিফেন্ডারদের মানবপ্রাচীর হয়ে দাঁড়ানোর কারণে গোলের সংখ্যা আর বাড়েনি।

কয়েকটি ছোট্ট পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই পরিষ্কার বোঝা যাবে ম্যাচের আসল ধাঁচটা। পুরো ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার গোলমুখে ২২টি শট নিয়েছে ইংল্যান্ড, যার মধ্যে ১১টি ছিল অন-টার্গেট বা পোস্টে। ইংলিশ গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ডকে করতে হয়েছে তিনটি দারুণ সেভ, যার মধ্যে ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে খুব কাছ থেকে নেওয়া একটি নিশ্চিত গোলের শট রুখে দেওয়াও অন্তর্ভুক্ত। তবে মাঠের অন্য প্রান্তে পিকফোর্ডের চেয়ে বহুগুণ বেশি ব্যস্ততায় সময় কেটেছে ক্রোয়াট গোলকিপার দমিনিক লিভাকোভিচের। পরাশক্তি ইংল্যান্ডের একের পর এক আক্রমণ সামলাতে গিয়ে পুরো ম্যাচে রেকর্ড সাতটি দুর্দান্ত সেভ করেছেন তিনি!

ম্যাচের ১২তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে ছয় গোলের গোলবন্যা আর রোমাঞ্চের দরজাটা খুলে দিয়েছিলেন হ্যারি কেইন। তবে পেনাল্টির এই প্রেক্ষাপট তৈরির পেছনে খলনায়ক বনে যান ক্রোয়েশিয়ার ৪০ বছর বয়সী চিরসবুজ মিডফিল্ডার লুকা মদরিচ। ক্রোয়াটদের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ক্যারিয়ারের পঞ্চম বিশ্বকাপ খেলতে নামা মদরিচ নিজের বক্সে বল ‘ক্লিয়ার’ করতে গিয়ে ইংলিশ ফরোয়ার্ড মাদুয়েকের উরুতে লাথি মেরে বসেন। সঙ্গে সঙ্গেই পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি।

তবে প্রথম দফায় কেইনের নেওয়া পেনাল্টি শটটি চমৎকারভাবে রুখে দিয়েছিলেন লিভাকোভিচ। কিন্তু নাটকের তখনও বাকি ছিল! ভিএআরের হস্তক্ষেপে দেখা যায়, কেইন শট নেওয়ার আগেই গোললাইন ছেড়ে সামনে এগিয়ে এসেছিলেন লিভাকোভিচ। ফলে পুনরায় পেনাল্টি শট নেওয়ার নির্দেশ দেন রেফারি এবং এবার আর লক্ষ্যভেদ করতে কোনো ভুল করেননি কেইন।

এই গোলের মাধ্যমে টাইব্রেকারের শুটআউট বাদে বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে সবচেয়ে বেশি গোল করার রেকর্ড এখন কেইনের। এই তালিকায় তিনি পেছনে ফেলে দিলেন লিওনেল মেসি, ইউসেবিও, রব রেনসেনব্রিঙ্ক ও গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতাকে; বিশ্বকাপে যাদের পেনাল্টি থেকে গোলসংখ্যা চারটি করে।

আরও পড়ুন

গোল হজম করার পর সমতায় ফিরতে ক্রোয়েশিয়া সময় নিয়েছে ২৪ মিনিট। ৩৬তম মিনিটে ক্রোয়াট মিডফিল্ডার মার্তিন বাতুরিনা বক্সের বাইরে থেকে এক দুর্দান্ত কোনাকুনি শটে বল জালে পাঠালে জমে ওঠে ম্যাচ। তবে আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণের সেই ধারায় প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার তিন মিনিট আগে আবারও লিড নেয় ইংল্যান্ড। ৪২তম মিনিটে ডেকলান রাইসের চমৎকার কর্নার থেকে জোরালো হেডে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন কেইন। কেইনের মতো সেরা হেডার বক্সে কীভাবে একদম পাহারাহীন থাকেন, তা নিয়ে ধারাভাষ্যকারদেরও বিস্ময়ের শেষ ছিল না!

তবে ক্রোয়াট রক্ষণের সেই ভুলে কেইন ততক্ষণে নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের তালিকায় বায়ার্ন মিউনিখের এই স্ট্রাইকার এখন যৌথভাবে শীর্ষস্থান ভাগ করে নিচ্ছেন কিংবদন্তি গ্যারি লিনেকারের সঙ্গে। লিনেকার ও কেইন–দুজনেরই বিশ্বকাপে ১২ ম্যাচে গোলসংখ্যা এখন সমান ১০টি।

ইংল্যান্ড ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর আক্রমণের গতি আরও বাড়ায় পেরিসিচ-বাতুরিনারা। সেই ধারায় প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে আবারও সমতায় ফেরে ক্রোয়েশিয়া। বক্সে উড়ে আসা বল ফরোয়ার্ড ইভান পেরিসিচ হেড করে সামনে বাড়িয়ে দিলে দারুণ এক শটে সমতাসূচক গোলটি করেন আরেক ফরোয়ার্ড পেতার মুসা। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ২-২।

২-২ ব্যবধানে সমতার পর দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ডকে পূর্ণ তিন পয়েন্ট এনে দেওয়ার একক চ্যালেঞ্জটা কাঁধে তুলে নেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা জুড বেলিংহাম। বিরতির পরপরই ৪৭ মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ‘অ্যাস্টন মার্টিন’ গাড়ির গতিতে ছুটে চমৎকার কোনাকুনি শটে গোল করেন এই মিডফিল্ডার। আর নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে বদলি হিসেবে নামা স্ট্রাইকার মার্কাস রাশফোর্ড অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় প্লেসিং শটে ম্যাচের শেষ গোলটি করলে ৪-২ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত হয় ইংল্যান্ডের।

ম্যাচ জয়ের পর কেইন বলেন, ‘ম্যাচটা দুই অর্ধে দুই রকম হয়েছে। প্রথম অর্ধে আমরা মোটামুটি ঠিকঠাকই খেলছিলাম। কিন্তু যেভাবে গোল হজম করেছি, তা সত্যিই হতাশাজনক; মনে হয়েছে কিছুটা হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম।’

ইংল্যান্ডের হয়ে ১১৫ ম্যাচে ৮১ গোল করা এই মহাতারকা এরপর ফাঁস করেন বিরতির পর ঘুরে দাঁড়ানোর আসল রহস্য, দ্বিতীয়ার্ধের পুরো কৃতিত্ব আমাদের কোচের। বিরতিতে ড্রেসিংরুমে তিনি আমাদের উদ্দেশে দারুণ এক বক্তব্য দেন। তিনি বলেছিলেন, যদি আমাদের হারতেই হয়, তবে যেন নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলে হারি। দ্বিতীয়ার্ধে আমাদের পারফরম্যান্সেই কোচের সেই কথার প্রতিফলন দেখা গেছে। আমরা পুরো শক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছি এবং ওরা আমাদের সেই গতির সঙ্গে কোনোভাবে মানিয়ে নিতে পারেনি।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad