গাজীপুরের কাপাসিয়ায় স্ত্রী, তিন মেয়ে ও শ্যালককে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ফোরকান মোল্লার মরদেহ মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
শনিবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন মাওয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক (আইসি) মো. ইলিয়াস। তিনি জানান, পদ্মা সেতু থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে লৌহজং উপজেলা ভূমি অফিস সংলগ্ন পদ্মা নদীতে একটি মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা নৌ পুলিশকে খবর দেয়। পরে বেলা ১২টার দিকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।
তিনি আরও জানান ফোরকান মোল্লার পরিবারের সদস্য ও কাপাসিয়া থানার তদন্ত কর্মকর্তা মরদেহটি প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করেছেন। সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
মুন্সিগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ সফিকুল ইসলাম জানান, পদ্মা সেতু থেকে ফোরকান নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন বলে তথ্য পেয়ে কাপাসিয়া থানা পুলিশ ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা চায়। পরে ডুবুরি দল ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার করে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ফোরকান মোল্লা পদ্মা সেতু থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।
পেশায় প্রাইভেটকার চালক ফোরকান গত ৮ মে রাতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন।
পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, ৮ মে শ্যালক রসূল মোল্লাকে গার্মেন্টসে চাকরি দেওয়ার কথা বলে গোপালগঞ্জ থেকে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় নিয়ে আসেন ফোরকান। পরে রাতের খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে পরিবারের সদস্যদের অচেতন করেন।
এরপর রাতে স্ত্রী শারমিন (৩৫), বড় মেয়ে মীম (১৬), মেজ মেয়ে মারিয়া (৮) ও শ্যালক রসূল মোল্লাকে (২২) ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। দুই বছর বয়সী মেয়ে ফারিয়াকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর ফোরকান পালিয়ে যান।
পুলিশ সুপার জানান, ঘটনার পর জেলা পুলিশ ও ডিবির তিনটি দল তদন্ত শুরু করে। ১১ মে মেহেরপুর সদর এলাকা থেকে এক ট্রাক হেল্পারের কাছ থেকে ফোরকানের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
জানা গেছে, ওইদিন সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে পদ্মা সেতুর রেলিংয়ের পাশে ফোনটি পড়ে থাকতে দেখে ট্রাক হেল্পার সেটি কুড়িয়ে নেন।
পরে পদ্মা সেতুর সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ১১ মে সকাল ৬টা ৪২ মিনিটে সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট পরা এক ব্যক্তি একটি সাদা প্রাইভেটকার থেকে সেতুর মাঝামাঝি স্থানে নামেন। কিছুক্ষণ পর তিনি রেলিং টপকে পদ্মা নদীতে ঝাঁপ দেন।
ওই ফুটেজ নিহতদের স্বজনদের দেখানো হলে তারা জানান, ঝাঁপ দেওয়া ব্যক্তি ফোরকানের মতো দেখতে। মোবাইল উদ্ধারের স্থান ও ঝাঁপ দেওয়ার স্থান একই হওয়ায় পুলিশ ধারণা করছে, নদীতে ঝাঁপ দেওয়া ব্যক্তি ফোরকান।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর ফোরকান তার বড় ভাই জব্বারকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালকসহ সবাইকে মেরে ফেলেছি। আমাকে তোমরা আর খোঁজো না। আমাকে আর পাবে না।’
তদন্তে আরও জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের পর ফোরকান কাপাসিয়া থেকে একটি প্রাইভেটকার ভাড়া করে ঢাকার মালিবাগে যান। পরে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় মুক্তাঙ্গন এলাকায় পৌঁছে ‘আত্মীয় মারা গেছে’ বলে ৬ হাজার টাকায় আরেকটি প্রাইভেটকার ভাড়া করে পদ্মা সেতুতে যান। সেখানে সেতুর মাঝখানে নেমে নদীতে ঝাঁপ দেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফফাক উজ্জামান, আবুল খায়ের, আমিরুল ইসলাম এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মো. যোবায়ের উপস্থিত ছিলেন।
গাজীপুর পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ফোরকান ছাড়া অন্য কারও সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে চূড়ান্ত পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


