সেনাবাহিনীর সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। সামরিক-বেসামরিক সব পক্ষেই এখন এটি ‘টক অব দ্য টাউন’।
দেশের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা প্রথম যে, সেনাবাহিনীর এত সংখ্যক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা একসঙ্গে একটি বেসামরিক আদালতের নজরদারির আওতায় এসেছেন। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক এবং কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (সিটিআইবি) কয়েকজন সাবেক প্রধান। আর এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে গুমের ঘটনায় জড়িত থাকা।
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কর্মকর্তারাও। যে বাহিনীটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের অভিযোগ আনছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
দেশের সবচেয়ে সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে পরিচিত বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনেই আলোড়ন সৃষ্টি করেনি বরং সামরিক বাহিনীকেও ফেলে দিয়েছে অস্বস্তিতে।
অবশ্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দ্রুতই তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। বাহিনীটির দাবি, কথিত অপরাধগুলো যখন সংঘটিত হয়েছিল তখন এসব কর্মকর্তারা সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় প্রেষণে ছিলেন। অর্থাৎ সরাসরি সেনাবাহিনীতে চাকরিরত অবস্থায় তারা এসব অপরাধে জড়াননি।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক বেশ জটিল। সে বাস্তবতায় এমন গুরুতর অপরাধে জড়িত সামরিক ব্যক্তিদের বিচারের অধিক্ষেত্র হিসেবে বেসামরিক আদালতকে মেনে নেওয়ার এই ঘটনা দেশের গণতন্ত্রের জন্য দারুণ ইতিবাচক। এই বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর মাধ্যমে এটি প্রমাণ হবে যে, পদ, পদবি বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কোনোকিছুই একজন মানুষকে আইনের ঊর্ধ্বে নিতে পারে না।
তবে বিষয়টি যে সংবেদনশীল, তা অস্বীকার করা যাবে না। দেশের নাগরিকদের একাংশ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিতে বিচার বিভাগের ক্ষমতার ওপর আস্থা রাখতে চায়। সেখানে একটি পক্ষ আশঙ্কা করছেন যে, রাজনৈতিক প্রভাব বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
একটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারিক প্রক্রিয়া কেবল ন্যায়বিচারের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনীর উপর জনসাধারণের যে আস্থা তা বজায় রাখার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ বাংলাদেশিদের কাছে সেনাবাহিনী ভীষণ সম্মানের। এই বাহিনীকে তারা জাতীয় ঐক্য, পেশাদারত্ব এবং আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন। দুর্যোগ মোকাবিলা থেকে শুরু করে বিদেশে শান্তিরক্ষা মিশন, এমনকি জাতি গঠনেও সামরিক বাহিনীর অবদান বিশাল ও ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ভাবনাও আছে যে, কয়েকজন বিপথগামী বা অভিযুক্ত সদস্যের কর্মকাণ্ড পুরো বাহিনীর খ্যাতিকে কলঙ্কিত করবে না। জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসনের প্রতি আনুগত্যের দাবি সমাজের গভীরে প্রোথিত, বিশেষত বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি দেশে যেখানে গণতন্ত্র এখনো পুরোপুরি পরিপক্ক হয়ে ওঠেনি।
এছাড়াও, রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হতে পারে বলেও মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। দীর্ঘ অপশাসনের শেখ হাসিনার সরকারের পতন পরবর্তী সময়ে দেশ যখন একটি সংকটকাল পার করছে তখন সেই সুযোগে অনেকেই ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টার মাধ্যমে রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই বিচারিক প্রক্রিয়াকে দলীয় এজেন্ডার সঙ্গে যুক্ত করা হলে তা ট্রাইব্যুনাল এবং সশস্ত্র বাহিনী উভয়েরই বিশ্বাসযোগ্যতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এটিকে সম্পূর্ণভাবে একটি বিচারিক বিষয় হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। কোনোভাবেই রাজনৈতিক লাভের জন্য এই মামলাগুলোকে ব্যবহার করা উচিত হবে না।
যদি এই বিচার প্রক্রিয়াটি পক্ষপাতদুষ্ট হয় বা নিরপেক্ষতা হারায় তাহলে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এর ফলে জনসাধারণের আস্থা নষ্ট হবে এবং সামরিক বাহিনীসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেবে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে যেন, কোনোভাবেই সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।
চলমান এসব ঘটনা আসলে বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের পরীক্ষা। সরকারের পক্ষ থেকে আইনের শাসন নিশ্চিতের যে প্রতিশ্রুতি মানুষকে দেওয়া হয়েছে, তা প্রমাণের বিষয়। যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজে সবাই এটাই প্রত্যাশা করে যে, প্রতিটি নাগরিকই আইনের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য; তা সে যত ক্ষমতাধরই হোক না কেন। ভয় বা পক্ষপাত ছাড়াই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কেবল দেশের সেই নীতিকেই সমুন্নত রাখবে না, বরং রাজনীতি থেকে ঊর্ধ্বে উঠে জাতির গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সামরিক বাহিনীর নৈতিক কর্তৃত্বকেও শক্তিশালী করবে।
ন্যায়বিচার বা প্রাতিষ্ঠানিক সততা কোনোটির সঙ্গেই আপস না করে বাংলাদেশ এই সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণটি পার হতে পারে কিনা তা আগামী কয়েক সপ্তাহেই বোঝা যাবে।
এখন পর্যন্ত এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, এই মামলার বিচারকাজ নিয়ে আরেকটি রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হলে তা মোকাবিলার সামর্থ এ মুহূর্তে বাংলাদেশের নেই। তারপরেও যদি তা ঘটেই যায়, তবে সেটি হবে বিচারব্যবস্থা এবং জাতির নৈতিক কাঠামো–উভয়ের জন্যই অপূরণীয় ক্ষতি।


