কয়েক দশক আগেও সাধারণ মানুষের কাছে এর পরিচয় ছিল কেবল ‘ব্যাঙের ছাতা’। অথচ সময়ের বিবর্তনে সেই মাশরুম দেশের কৃষি অর্থনীতিতে এখন এক অন্যতম পণ্য। রাজধানীর খুব কাছেই সাভার বাসস্ট্যান্ডের মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মূল গেটের পাশে খোলা জায়গায় গড়ে উঠেছে দেশের মাশরুমের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার। সপ্তাহে সাত দিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই বাজারে চলে জমজমাট বেচাকেনা।
দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি জেলা-উপজেলা থেকে চাষীরা এখানে মাশরুম নিয়ে আসেন। দূর-দূরান্তের যেসব চাষী সরাসরি আসতে পারেন না, তারা পরিবহনের মাধ্যমে মাশরুম পাঠান। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে লেনদেন হচ্ছে ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।
বর্তমানে রাজধানীর বড় বড় রেস্টুরেন্ট এবং পাঁচ তারকা হোটেলগুলো এই বাজারের মূল ক্রেতা। হোটেল মালিকরা এখান থেকেই তাদের প্রয়োজনীয় মাশরুম সংগ্রহ করেন। ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষেত্রে তিন থেকে ছয় মাসের চুক্তিতেও এসব স্থানে নিয়মিত মাশরুম সরবরাহ করছেন।
বাজারে বর্তমানে হরেক রকমের মাশরুমের সমাহার দেখা যায়। এর মধ্যে বাটন মাশরুম, ঋষি মাশরুম, গোল্ডেন ওয়েস্টার, কান মাশরুম, মানকিহেড, শীতাক ও মিল্কি মাশরুম অন্যতম।
শুধু কাঁচা মাশরুমই নয়, এখানে পাওয়া যাচ্ছে মাশরুমের পাউডার, স্যুপ ও বিভিন্ন উপজাত পণ্য। এসব পণ্যের মধ্যে হার্টের ওষুধ, শক্তিবর্ধক ওষুধ এবং মাশরুমের সাবান বিক্রি করে অনেক উদ্যোক্তাই এখন স্বাবলম্বী।
আধুনিক এই যুগে মাশরুমের বহুমুখী ব্যবহার বাড়ছে। মাশরুম দিয়ে এখন তৈরি হচ্ছে কেক, শাসলিক, কাটলেট, ফ্রাই, ভর্তা, রোল, নুডলস ও সালাদ। এমনকি মাশরুমের চপ, পিঠা-পুলি, হালুয়া, চা ও কফিও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের অধীনে সারাদেশে বর্তমানে ৩৪টি সাব-সেন্টার কাজ করছে। নিয়মিত মাশরুম কেনেন এমন ক্রেতারা জানান, এই সবজি খাওয়ার ফলে তারা শারীরিক অনেক উপকার পাচ্ছেন।
মাশরুমের পুষ্টিগুণও অনেক। সাভারে অবস্থিত ‘মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ’ প্রকল্পের পরিচালক কৃষিবিদ ড. আখতার জাহান কাকন জানান, মাশরুম অত্যন্ত প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার। এতে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ প্রোটিন থাকে। এছাড়া এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ডি, মিনারেল, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস রয়েছে।
আখতার জাহান কাকন আরও জানান, দেশে বর্তমানে মাশরুম উদ্যোক্তার সংখ্যা ৬ শতাধিক। গ্রুপ ফার্মার রয়েছেন প্রায় এক হাজার ৮০০ জন। প্রতি বছর দেশে প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন মাশরুম উৎপাদন হচ্ছে যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৮০০ থেকে ৮৫০ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে মাশরুম চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের সাথে সরাসরি জড়িত প্রায় দেড় লাখ মানুষ। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, দেশের চাহিদা মিটিয়ে অচিরেই বড় পরিসরে বিদেশে মাশরুম রপ্তানি করা সম্ভব হবে।


