ক্ষমতার অপব্যবহার, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো মারাত্মক অপরাধ ও নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়া সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ দুবাইতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা এক মামলায় ইন্টারপোলের জারি করা রেড নোটিশের ভিত্তিতে গত শুক্রবার দুবাইয়ের একটি শপিং মল থেকে তাকে আটক করা হয়।
দুবাই পুলিশ বাংলাদেশ ও পর্তুগালসহ তার কাছে থাকা পাসপোর্টগুলো জব্দ করেছে। তাকে যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকার। দুর্নীতির অভিযোগে কোনো সাবেক শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তার বিদেশে আটক হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম।
পুলিশের শীর্ষ পদে থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, গুম, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠে। দুদক ইতিমধ্যে তার ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা দায়ের করেছে। এছাড়া শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডসহ হত্যা ও হত্যায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আরও ১৮টি মামলা রয়েছে।
এসব অভিযোগের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন মাস আগে তিনি সপরিবারে দেশ ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে দুদকের মামলার ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে।
বেনজীর আহমেদ তার কর্মজীবনে ডিএমপি কমিশনার, র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালনকালে তিনি ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করলেও তাকে কোনো জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হয়নি। জানা গেছে, তিনি কেবল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জবাবদিহি করতেন এবং রাষ্ট্রের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হতেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং দুদকের উপপরিচালক আখতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা চলছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা বেনজীরের বিরুদ্ধে ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ মে তিনি স্ত্রী ও কন্যাদের নিয়ে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকা ত্যাগ করেন। এরপর থেকে বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছিলেন। দেশ ছাড়ার আগে তিনি অবৈধ উপায়ে অর্জিত বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বেনজীর আহমেদ কোনো ঝামেলা ছাড়াই বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত ইন্টারপোলের রেড নোটিশের কারণে তাকে গ্রেপ্তার হতে হয়।
উচ্চ পদে থেকে ঔদ্ধত্য
বেনজীর আহমেদ ২০১০ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজত-ই-ইসলামের সমাবেশ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে যৌথ বাহিনীর যে অভিযানের মাধ্যমে ছত্রভঙ্গ করা হয়েছিল, সেই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। সে সময় হেফাজত কর্মীদের ওপর সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ করেছিল পুলিশ।
অবশ্য তিনি দাবি করেছিলেন তার নেতৃত্বে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই ঘটনায় ৫৮ জন নিহত হয়েছিলেন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে দায়ের করা মামলাটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) বিচারাধীন রয়েছে, যেখানে বেনজীর অন্যতম একজন আসামি।
২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার এই মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত কর্মীদের অপহরণ, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অসংখ্য অভিযোগ ওঠে, যার মধ্যে বহুল আলোচিত নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলাও রয়েছে। রাজনৈতিক দমনের অংশ হিসেবে তিনি এসব কৌশল ব্যবহার করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। র্যাবের প্রধান হলেও তিনি পুলিশের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে জবাবদিহি করতেন না।
২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল আইজিপি হওয়ার পর বেনজীর আহমেদ আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি বিভিন্ন ব্যবসায় জোরপূর্বক অংশীদারিত্ব নিতেন এবং জমি দখলে মেতে ওঠেন। পুলিশের প্রধান হওয়া সত্ত্বেও তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের মধ্যে অত্যন্ত ক্ষমতাশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তিনি কেবল প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মানতেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও তোয়াক্কা করতেন না। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করতেন।
পুলিশ ও র্যাবের শীর্ষ পদে থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জমি দখলের অভিযোগ ওঠে। অবৈধ উপায়ে অর্জিত শত শত একর জমি এবং বেশ কয়েকটি রিসোর্টের মালিকানা রয়েছে তার নামে। দুদকের অনুসন্ধানে তার ও তার পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের সন্ধান মিলেছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিষেধাজ্ঞা
র্যাব প্রধান এবং আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তার বিরুদ্ধে একাধিক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এছাড়া ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ওপর অগ্নিসংযোগের ঘটনায়ও তার নাম জড়িয়ে পড়ে। র্যাবে থাকাকালীন তার মেয়াদে অসংখ্য অপহরণ, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় তোলে। এর ফলে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেনজীর আহমেদসহ র্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
হত্যা মামলা
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন ছাত্র ও বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার ঘটনায় ঢাকা ও দেশের অন্যান্য স্থানে তার বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় তাকে হত্যার ‘আদেশদাতা’ হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র্যাবের টিএফআই সেলে গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায়ও তিনি অভিযুক্ত। মামলাটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
দুদকের মামলা
দুদক বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মোট ছয়টি মামলা দায়ের করেছে। এর মধ্যে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের একটি মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ চলছে এবং বাকি পাঁচটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের মামলার বিচার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পাসপোর্ট জালিয়াতি, দুর্নীতি এবং সম্পদ গোপনের অভিযোগে বাকি পাঁচটি মামলার তদন্ত চলছে, যেগুলোতে আদালত ইতিমধ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। এছাড়া মিথ্যা তথ্য দিয়ে একাধিক পাসপোর্ট নেওয়ার অভিযোগে আরেকটি পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলাও তদন্তের অধীন রয়েছে।
ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ
রোববার জাতীয় সংসদে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তাকে দেশে আনতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ফেডারেল আইন অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে প্রত্যর্পণ বা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জমা দিতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে আরও জানান, পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) এর আগে বেনজীরকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়েছিল। সেই অনুরোধের প্রেক্ষিতে ইন্টারপোল ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল একটি রেড নোটিশ জারি করে, যার ভিত্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ তাকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এনসিবি ইন্টারপোলের মাধ্যমে দুবাই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। অন্যদিকে দুদক প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় মামলার নথিপত্র, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং তদন্তের রেকর্ড প্রস্তুত করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাবটি চূড়ান্ত ও অনুমোদন করার পর তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। এই আইনি প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর আবু ধাবির এনসিবির সাথে সমন্বয় করে তাকে দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।


