সাতছড়ি বনে কাঠচোরদের থাবা

সাতছড়ি বনে কাঠচোরদের থাবা
Advertisement
Advertisement

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে আবারও গাছ চুরির অভিযোগ উঠেছে। রাতের অন্ধকারে সংরক্ষিত এই বনের ভেতর থেকে ২৫ থেকে ৩০টি গাছ কেটে নিয়ে গেছে একটি চক্র।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বিভাগীয় বন কর্মকর্তার প্রতিনিধি হিসেবে সহকারী বন সংরক্ষক মির্জা মেহেদী সারওয়ার ১৮ মে বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এর আগে, জাতীয় উদ্যান থেকে গাছ চুরির ঘটনায় ১৭ মে রাতে চুনারুঘাট থানায় একটি মামলা করা হয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২৪৩ হেক্টর আয়তনের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। ২০০৫ সালে এই বনকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তের কাছে অবস্থিত এই বনের ভেতর দিয়ে সাতটি প্রাকৃতিক ছড়া বা জলধারা প্রবাহিত হওয়ায় এর নাম হয়েছে সাতছড়ি। এই উদ্যানটি উল্লুক, চশমা পরা হনুমান, মায়া হরিণ ও বনরুইসহ নানা বিরল বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। শতবর্ষী সেগুন, গর্জন, চম্পাফুল, কড়ই এবং বিভিন্ন ওষুধি গাছ দীর্ঘদিন ধরে এই বনের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ধরে রেখেছে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি সংগঠিত চক্র বছরের পর বছর ধরে এই বন থেকে গাছ চুরি করে আসছে।

উদ্যানের ডুমুরতলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দুটি বিশাল শতবর্ষী সেগুন গাছ কেটে নেওয়ার পর  সেখানে শুধু গাছের গোড়া পড়ে আছে। সেখান থেকে আরও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে একই আকারের আরও দুটি গাছ কাটা অবস্থায় পাওয়া যায়। বনের প্রায় এক কিলোমিটার পথ হাঁটলে এমন আরও অনেক গাছের গোড়া চোখে পড়ে, যা বনের এই ধ্বংসযজ্ঞের নীরব সাক্ষ্য দিচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, পুরো বন ভালোভাবে খুঁজলে অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি কাটা গাছ পাওয়া যাবে। এই গাছগুলো মাত্র দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে কাটা হয়েছে। এর আগেও অনেক গাছ কেটে নেওয়ায় বনের বিভিন্ন অংশে এখনো পুরোনো গাছের মূল বা শিকড় দেখা যায়।

আরও পড়ুন

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চক্রের সঙ্গে কেবল কাঠচোরই নয়, বরং কিছু অসৎ বনকর্মী, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যও জড়িত। তারা বলেন, বছরের পর বছর ধরে এভাবে অবৈধভাবে গাছ কাটার ফলে বনের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

বেশ কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়া ছাড়া বন থেকে এত বড় বড় গাছ কেটে নেওয়া সম্ভব নয়। এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বন ধ্বংস করার জন্য সবাই একসঙ্গে কাজ করছে। তা না হলে এত বড় বড় গাছ কেটে পাচার করা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।

স্থানীয়রা জানান, এর আগেও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে গাছ চুরির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেসব ঘটনার পর দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কার্যকর পদক্ষেপের অভাবই বনখেকো চক্রটিকে আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলেছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, একটি বড় গাছ কাটার মানে কেবল একটি গাছ হারানো নয়। এর সঙ্গে অনেক প্রাণীর আবাসস্থল, পাখির আশ্রয়, মাটির আর্দ্রতা এবং বনের পরিবেশগত ভারসাম্য ধ্বংস হয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, যেভাবে গাছ কাটা চলছে তা যদি অব্যাহত থাকে, তবে সাতছড়ির জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। বন ধ্বংসের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তীব্র হবে, বৃষ্টিপাত কমবে, মাটি ক্ষয় বাড়বে এবং অনেক বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাবে।

সাতছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহেদী হাসান জানান, পার্ক থেকে দুটি সেগুন গাছ চুরি হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে এমন কয়েকজনকে পুলিশ ইতিমধ্যে শনাক্ত করতে পেরেছে।

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, তিনি একটি সরকারি প্রশিক্ষণে থাকায় বিষয়টি সম্পর্কে এখনো তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গালিব চৌধুরী বলেন, বিষয়টি নজরে আসার পর জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad