গত সাড়ে ছয় বছরে রাজধানী ঢাকায় ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৮৪ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৯২ জনই পথচারী, যা মোট নিহতের ৪২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। একই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ২ হাজার ৪৮৮ জন।
২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত রাজধানীর সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৩৪ জন, যা মোট মৃত্যুর ৭৪ দশমিক ৭১ শতাংশ। এ ছাড়া ২১৯ জন নারী বা ১৫ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং ১৩১ জন শিশু বা ৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ নিহত হয়েছে।
দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে পথচারীর পর সবচেয়ে বেশি ছিলেন মোটরসাইকেল আরোহী। এই সময়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৫৩৬ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ৩৮ দশমিক ৭২ শতাংশ। বাস, রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালক ও যাত্রী নিহত হয়েছেন ২৫৬ জন বা ১৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
রাতে দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, রাতে সবচেয়ে বেশি ৫১৯ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
এ ছাড়া সকালে ২৫৮ জন বা ১৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ, দুপুরে ১৯৫ জন বা ১৪ দশমিক ০৮ শতাংশ, বিকেলে ১৭৪ জন বা ১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ, ভোরে ১৪২ জন বা ১০ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং সন্ধ্যায় ৯৬ জন বা ৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ নিহত হয়েছেন।
সংস্থাটির পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, রাজধানীতে রাতে ও সকালে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। বাইপাস সড়ক না থাকায় রাত ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত রাজধানীর সড়কে মালবাহী ভারী যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। ফলে রাস্তা পারাপারের সময় পথচারীরা বেশি নিহত হচ্ছেন।
এ ছাড়া দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকার কারণে যানবাহনের চালকদের আচরণে অসহিষ্ণুতা তৈরি হচ্ছে এবং ধৈর্য কমে যাচ্ছে। এটিও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে।
দুর্ঘটনায় বেশি সম্পৃক্ত ভারী যান
রাজধানীর সড়ক দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের মধ্যে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ, ট্যাংকার ও ময়লাবাহী ট্রাকের হার সবচেয়ে বেশি—৩৩ দশমিক ২৫ শতাংশ।
এ ছাড়া মোটরসাইকেল ২৬ শতাংশ, বাস ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ, অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও লেগুনা ১২ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং মাইক্রোবাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও জিপ ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলেছে, রাজধানীতে যানবাহনের তুলনায় সড়কের পরিমাণ অপ্রতুল। একই সড়কে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহনের পাশাপাশি ধীরগতির ও দ্রুতগতির যান চলাচল করে। ফুটপাত হকারদের দখলে থাকা, ফুটওভারব্রিজ যথাযথ স্থানে নির্মাণ না করা, সেগুলো ব্যবহার উপযোগী না থাকা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের অসচেতনতার কারণে অতিমাত্রায় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড ও বিমানবন্দর সড়ক দুর্ঘটনার ‘হটস্পট’ হয়ে উঠেছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
প্রতিবছরের দুর্ঘটনার চিত্র
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে রাজধানীতে ১২৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১২৬ জন নিহত এবং ২৩৩ জন আহত হন।
২০২১ সালে ১৩৭টি দুর্ঘটনায় ১৪১ জন নিহত ও ২৪৭ জন আহত হন। ২০২২ সালে ২৬৮টি দুর্ঘটনায় ২৫৬ জন নিহত এবং ৩২৪ জন আহত হন।
২০২৩ সালে ২৯৬টি দুর্ঘটনায় ২৪৯ জন নিহত ও ৩৩৫ জন আহত হন। ২০২৪ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯৪টিতে। ওই বছর ২৪৬ জন নিহত ও ৪৮২ জন আহত হন।
২০২৫ সালে ৪০৭টি দুর্ঘটনায় ২২৯ জন নিহত এবং ৫১১ জন আহত হন। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে ২২৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন নিহত ও ৩৫৬ জন আহত হয়েছেন।
রাজধানীর পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক বাসসেবা চালুর পরামর্শ দিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি), ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি।


