সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বড় সুখবর নিয়ে আসছে নতুন বেতন কমিশন। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২১ সদস্যের বেতন কমিশন সরকারি চাকুরেদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে।
বুধবার বিকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন।
কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, ২০টি ধাপের বেতনকাঠামো অপরিবর্তিত রেখে সর্বনিম্ন বা ২০তম ধাপের বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বা প্রথম ধাপের বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এবারের প্রতিবেদন তৈরিতে সাধারণ মানুষের মতামতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, অনলাইনে পরিচালিত এক জরিপে প্রায় ৭৮ লাখ অংশগ্রহণকারী তাদের মতামত দিয়েছেন। মূল্যস্ফীতি এবং বর্তমান জীবনযাত্রার মান বিবেচনা করেই কমিশন এই সুপারিশমালা প্রণয়ন করেছে।
নতুন এই বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সুপারিশ অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আংশিক বেতনকাঠামো কার্যকর হবে। তবে পূর্ণাঙ্গ রূপ বা পুরো মাত্রায় এটি বাস্তবায়ন শুরু হবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে।

আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি ভাতা ও পেনশনের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে কমিশন। নববর্ষের বৈশাখী ভাতা বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। যাতায়াত ভাতার পরিধি বাড়িয়ে এখন ১০ম ধাপ পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছে, যা আগে শুধু ১১তম থেকে ২০তম ধাপের কর্মচারীরা পেতেন। বাড়িভাড়ার ক্ষেত্রে ১১তম থেকে ২০তম ধাপের কর্মচারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি হারের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগে প্রথম থেকে দশম ধাপের জন্য বেশি ছিল।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পেনশনের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। যারা মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাদের ক্ষেত্রে প্রায় ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। একইভাবে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশনভোগীদের জন্য ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। চিকিৎসোভাতার ক্ষেত্রে ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ১০ হাজার টাকা এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বেসামরিক প্রশাসনের এই প্রতিবেদন দাখিলের পর সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বেতন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
গত বছরের ২৭ জুলাই সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে। ২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের পর দীর্ঘ ১২ বছর পর এই কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত শেষ তারিখ ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। কমিশন তাদের জন্য নির্ধারিত বাজেটের মাত্র ১৮ শতাংশ ব্যয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুত করে।
প্রধান উপদেষ্টা প্রতিবেদন গ্রহণ করে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। এ সময় তিনি বলেন, ‘এটি একটি মস্ত বড় কাজ। মানুষ বহুদিন ধরে এর জন্য অপেক্ষা করছে। আউটলাইন দেখে বুঝলাম, এটি খুবই সৃজনশীল কাজ হয়েছে।’
এ সময় কমিশনের প্রধান বলেন, গত এক দশকে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে অর্থনীতির প্রায় সকল সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সময়োপযোগী ও যথাযথ বেতন কাঠামো নির্ধারণ না হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সুস্পষ্ট কার্যপরিধি নির্ধারণপূর্বক বিদ্যমান বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে কমিশন কাজ করে, যোগ করেন তিনি।


