সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল: এক শিশুর মৃত্যুতে খুলল আইসিইউ

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল: এক শিশুর মৃত্যুতে খুলল আইসিইউ
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত দেশের একমাত্র বিশেষায়িত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বর্তমান চিত্র অত্যন্ত করুণ। হাসপাতালের ভেতর কান পাতলেই শোনা যায় অসুস্থ শিশুদের কান্না আর স্বজনদের আর্তনাদ। চরম অব্যবস্থাপনা আর রোগীর উপচে পড়া ভিড়ে হাসপাতালটি এখন দিশেহারা।

হাসপাতালের পঞ্চম তলার ধনুষ্টংকার ওয়ার্ডের সিঁড়ির ঠিক সামনেই একটি পাতলা কাঁথা বিছিয়ে বসে আছেন হালিমা আকতার। তার কোলে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে ছয় মাস বয়সী সন্তান আবদুর রহমান। শিশুটি একই সঙ্গে হাম, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে।

বরিশাল সদর হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার আশায় হালিমা তার সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলেও অন্য শিশুদের সংক্রমণের ঝুঁকির আশঙ্কায় তাদের এই হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। হালিমা আকতার আক্ষেপ করে জানান, জরুরি বিভাগে ডাক্তার দেখিয়ে সন্তানকে ভর্তি করতে পারলেও কোনো শয্যা জোটেনি। নিরুপায় হয়ে হাসপাতালের মেঝেতেই আশ্রয় নিতে হয়েছে। সন্তানের অবস্থা আশঙ্কাজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডাক্তার কেবল নেবুলাইজার দিতে বলেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত অক্সিজেন দেওয়া শুরু হয়নি।

১০০ শয্যার এই হাসপাতালটি এখন রোগীর চাপে পিষ্ট। রোগীদের ভুক্তভোগী স্বজনদের অভিযোগ, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় না হওয়া এবং এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে শিশুদের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটছে।

রাশেদ আলম নামের এক বাবা তার আড়াই মাস বয়সী কন্যা রাফসা মনিকে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল ও কলেরা হাসপাতাল ঘুরে শেষে এখানে এসেছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এত জায়গা ঘুরেও চিকিৎসকরা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না তার সন্তানের আসলে কী রোগ হয়েছে। এখানে আসার পর দুই দিন অপেক্ষা করে তবেই একটি বেড পেয়েছেন। সেটিও সম্ভব হয়েছে তার সন্তানের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ায় অন্য একজন অপেক্ষাকৃত কম গুরুতর রোগীকে মেঝেতে পাঠিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান হিরা নামের আরেক অভিভাবক, যার ছয় মাস বয়সী কন্যা হুমায়রাকে নিয়ে একাধিক হাসপাতাল ঘুরেও সঠিক রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন

বরগুনা থেকে আসা রফিকের আড়াই বছর বয়সী ছেলে রোহানের পরিস্থিতি আরও জটিল। নিউমোনিয়া ও হাম থেকে সেরে ওঠার পর তার শরীরে যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছে। সাধারণ ওয়ার্ডে দুই দিন অপেক্ষার পর গত বুধবার তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

তবে এই আইসিইউ সচল হওয়ার পেছনে লুকিয়ে আছে এক মর্মান্তিক কাহিনী। প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে হাসপাতালের এই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটটি অচল পড়ে ছিল। গত ১৪ মার্চ সাভার থেকে আসা আট মাস বয়সী শিশু সাইয়েদ হাম ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হলেও আইসিইউ সেবার অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এই করুণ মৃত্যুর পরেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের টনক নড়ে। দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে দীর্ঘদিনের অচল আইসিইউ ১৭ মার্চ থেকে প্রস্তুত করা হয় এবং ১৮ মার্চ রোহানকে ভর্তির মাধ্যমে তা পুনরায় সচল করা হয়। অর্থাৎ, একটি শিশুর প্রাণের বিনিময়ে অবশেষে অন্য শিশুদের জন্য খুলল আইসিইউর দরজা।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর যেখানে হামের রোগী ছিল মাত্র ৬৯ জন, সেখানে চলতি বছরের মার্চ মাস পার হওয়ার আগেই সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫৫ জনে। হাসপাতালের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত বেডের বাইরেও মেঝেতে গাদাগাদি করে রোগীদের রাখা হয়েছে। সীমিত জনবল নিয়ে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।

হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু) ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাদের রাউন্ড দিতে হচ্ছে। রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুতর রোগীদের বেড দিয়ে অন্যদের মেঝেতে রাখতে হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এখন দুই বছরের বেশি বয়সী রোগীদের ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ যা বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচির অভাবনীয় সাফল্যে যেখানে ২০০০ সালের ৫ হাজার ৯৮ জন রোগী ২০২৪ সালে মাত্র ২৪৭ জনে নেমে এসেছিল, সেখানে বর্তমানের এই প্রাদুর্ভাব বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুটি ডোজ টিকার মাধ্যমে এই রোগ ঠেকানো সম্ভব হলেও কেন এই বিপুল সংখ্যক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে এবং কেন জীবন রক্ষাকারী আইসিইউ সচল করতে একটি শিশুর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হলো, সেই প্রশ্নটিই এখন জনমনে বড় হয়ে উঠেছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad