প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) অনুমোদিত পলির সংকটের কথা উল্লেখ করে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া উপজেলায় স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের খাবার সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে দুই উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা গেছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস বলছে, বিএসটিআই অনুমোদিত প্যাকেজিং পলি না পাওয়ায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান খাবার দেওয়া বন্ধ রেখেছে। অন্যদিকে কুলাউড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের দাবি, খাবারের নিম্নমান নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘অভিমান’ করে খাবার সরবরাহ বন্ধ করেছে।
বুধবার শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে দেওয়া এক লিখিত আবেদনে স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইসলাম ট্রেডার্সের প্রোপ্রাইটর মো. শফিকুল ইসলাম জানান, নির্ধারিত মান বজায় রেখে খাবার সরবরাহ করতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও বিএসটিআই অনুমোদিত বিশেষ পলি ব্যবহার বাধ্যতামূলক। বর্তমানে ওই পলির সাময়িক সংকট থাকায় প্যাকেজিং ও সরবরাহ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, আগামী দুই থেকে তিন দিন স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের খাবার সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার সরবরাহ শুরু করা হবে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার আ. ছত্তার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গণেশ লাল কৈরী বলেন, ‘শনিবার থেকে আগামী তিন-চার দিন স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের খাবার সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে বলে শিক্ষা অফিস থেকে জানানো হয়েছে।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান লিখিতভাবে জানিয়েছে, বিএসটিআইয়ের পলি প্যাকেটিং না পাওয়ায় তারা আগামী তিন দিন খাবার সরবরাহ করতে পারবে না।’
তিনি আরও বলেন, গত সপ্তাহে উপজেলার টিকরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিংয়ের খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ ওঠে। পরে শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে একটি তদন্ত দল সরেজমিনে যায়।
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্ত কমিটি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তবে শুনেছি তারা তদন্ত করেছে এবং প্রতিবেদন ঢাকায় পাঠিয়েছে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হয়তো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবহৃত বনরুটির প্যাকেট বিএসটিআই অনুমোদিত নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।’
তিনি জানান, শ্রীমঙ্গল উপজেলার ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ কার্যক্রম চালু রয়েছে। তার তথ্য অনুযায়ী, একই প্রতিষ্ঠান সিলেট বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় স্কুল ফিডিংয়ের খাবার সরবরাহ করছে।
অন্যদিকে কুলাউড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. খুরশেদ আলম বলেন, ‘আজকে খাবার দেওয়া হয়নি। একটি সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর তারা অভিমান করে খাবার দেয়নি।’
কতদিন বন্ধ থাকবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা বলছি। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ডাকা হয়েছে। বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কুলাউড়া উপজেলায় ১৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। কলা, ডিম ও বনরুটি সরবরাহ করা হয়। ৫ থেকে ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা থাকতে পারে। কোথাও কলা বেশি পাকা বা কম পাকা হয়, আবার বনরুটির প্যাকেটেও সমস্যা ছিল।’
নষ্ট ডিমের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘২৩ হাজার ডিম সরবরাহ করা হয়। কোনো কোনো জায়গায় এক থেকে দুটি নষ্ট ডিমের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিয়মিত এমন হচ্ছে না।’
কুলাউড়ার স্থানীয় ঠিকাদার ফারহান চৌধুরী সামী বলেন, ‘আমি মূল ঠিকাদার না। ইসলাম ট্রেডার্স মূল ঠিকাদার। আমি স্থানীয়ভাবে কাজ করছি।’
ইসলাম ট্রেডার্সের স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা খাইরুল বাশার বলেন, ‘যে পলির নমুনা অনুমোদন করিয়ে আনা হয়েছিল, এখন সেটার চাহিদা সারা দেশে বেড়ে গেছে। শুধু আমাদেরই প্রতি মাসে তিন থেকে চার টন প্রয়োজন হচ্ছে। এতে বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে এবং দামও বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সিলেট বিভাগের শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, বাহুবল ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় আমরা খাবার সরবরাহ করছি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একটি স্কুলের ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীর জন্য খাবার দিতে হয়। কিন্তু বৃষ্টির কারণে উপস্থিতি কম থাকায় অনেক খাবার ফেরত আসছে। এতে আমাদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী দুর্যোগের সময় শিক্ষার্থী উপস্থিত না থাকলেও খাবার ফেরত আনার কথা না। কিন্তু কিছু স্কুলে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের খাবার রেখে বাকিগুলো ফেরত দেওয়া হচ্ছে।’
খাবারের মান নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বিএসটিআই অনুমোদিত কারখানা থেকে খাবার সংগ্রহ করি। কুলাউড়া ও শ্রীমঙ্গল মিলিয়ে ৩৩৪টি স্কুলে প্রায় ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য খাবার সরবরাহ করছি। কোথাও সমস্যা হলে শিক্ষকদের বদলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া আছে।’


