দেশে প্রথম তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করে কৃতিত্ব দেখালেও বর্তমানে সেই আইনের সংস্কার নিয়ে রহস্যজনক পিছুটান দিচ্ছে বিএনপি। নির্বাচনী ইশতেহারে তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইনের প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় এসে আইনের শক্তিশালী ধারাগুলো বাতিলের উদ্যোগে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দলটির সদিচ্ছা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণের ইতিহাসে ২০০৫ সাল ছিল একটি মাইলফলক। কারণ সেসময় তৎকালীন বিএনপি সরকারই দেশে প্রথম ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন’ প্রণয়ন করেছিল। এমনকি গত সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারেও দলটি অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
তবে ক্ষমতার পালাবদলে সেই অঙ্গীকার এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অভিযোগ ওঠেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে তৈরি করা জনবান্ধব তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটিকে বর্তমান সরকার সংসদে হুবহু পাস না করে এর গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো বাতিলের মাধ্যমে আইনটিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ পর্যালোচনায় গঠিত সংসদের বিশেষ কমিটি তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশের বেশ কিছু ধারায় পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে। তাদের সুপারিশ করা ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ গত ৭ এপ্রিল সংসদে উত্থাপন করা হয়। তবে সেদিন বিলটি পাস হয়নি।
বিশেষ কমিটির প্রস্তাবিত নতুন সংশোধনীতে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে কার্যত দন্তহীন করার চক্রান্ত চলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন সংশোধনীতে ই-সিগারেট বা ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম এবং হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্টের মতো ক্ষতিকর উদীয়মান তামাকজাত পণ্যের সংজ্ঞা ও নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত ধারাগুলো বাদ দেওয়া হয়। এর ফলে তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন আপদ হিসেবে আসা এসব পণ্যের বাজারজাতকরণ দেশে বৈধতা পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অধ্যাদেশ থেকে আরও দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান সরিয়ে ফেলার চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে একটি হলো বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেট বা মোড়ক প্রদর্শনী নিষিদ্ধ করার বিধান। অন্যটি হলো পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান না রাখার বিধান।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিক্রয়স্থলে তামাক পণ্যের প্রদর্শনীর সুযোগ থাকলে কিশোর ও তরুণরা সহজেই তামাকের প্রতি আকৃষ্ট হবে। অন্যদিকে গণপরিবহন ও জনসমাগমস্থলে ধূমপানের আলাদা জায়গা রাখার সুযোগ দিলে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়ে সাধারণ মানুষ ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে।
তামাকবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের মতে, নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবং জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। তামাক কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় একটি শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক মানের আইনকে এভাবে কাটছাঁট করা হলে তা দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জনে জনস্বার্থবিরোধী কাটছাঁট ছাড়াই অধ্যাদেশটি তার মূল রূপে দ্রুত পাস করার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।


