চীন সফর শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার দুপুরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আমন্ত্রণে চা পান ও মধ্যাহ্নভোজ সেরে বেইজিং থেকে দেশের পথে রওনা হন তিনি।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, চীনা নেতাদের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত প্রাক্তন রাজকীয় উদ্যান চুংনানহাই কমপ্লেক্সে শেষ বৈঠকের আগে ট্রাম্প শি জিনপিংকে বলেন, ‘এটি ছিল অসাধারণ একটি সফর। আমার মনে হয়, এর মাধ্যমে অনেক ভালো কিছু হয়েছে।’
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, এই উদ্যানটিই বর্তমানে চীনের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন। শুক্রবার ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শেষ আনুষ্ঠানিক বৈঠকের জন্য চুংনানহাইয়ে স্বাগত জানান শি জিনপিং।
এ সময় দুই নেতা প্রাচীন বৃক্ষ ও চীনা গোলাপে সাজানো প্রাঙ্গণে কিছুক্ষণ হেঁটে সময় কাটান। পরে তারা সবুজ স্তম্ভ ও ছাউনিযুক্ত পথ ধরে হাঁটেন, যেখানে পাখি ও চীনের ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি দৃশ্যের চিত্র আঁকা ছিল।
ট্রাম্প চীনা গোলাপের বিভিন্ন জাত দেখে বলেন, ‘আমার মনে হয় না পৃথিবীর আর কোথাও এতো সুন্দর গোলাপ বাগান আছে। এটি নিশ্চিতভাবে যে কাউকে মুগ্ধ করবে।’
চা ও মধ্যাহ্নভোজের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং তাদের শীর্ষ সহকারী ও দোভাষীদের সঙ্গে নিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন। এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার তিন দিনের চীন সফর শেষ করেন।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত কয়েকটি দিন সত্যিই দারুণ কেটেছে।’
অন্যদিকে শি জিনপিং এই সফরকে ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি নতুন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছি, বরং বলা ভালো—একটি গঠনমূলক, কৌশলগত ও স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তুলেছি।’

তবে শুক্রবারের বৈঠকের ঠিক আগে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে কঠোর ভাষায় নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করে।
মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলে, ‘এই সংঘাত, যা কখনোই হওয়া উচিত ছিল না, তা চালিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।’
একই সঙ্গে তারা জানায়, জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা এই যুদ্ধ বন্ধে শান্তিচুক্তির প্রচেষ্টাকে চীন সমর্থন করছে।
চুংনানহাইয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি ও শি জিনপিং ইরান নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং তাদের অবস্থান ‘খুবই কাছাকাছি’। তবে এ বিষয়ে শি জিনপিং প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
বেইজিং ছাড়ার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বিভিন্ন ব্যবসায়িক চুক্তিতে সফলতার কথাও তুলে ধরেন। অবশ্য সেগুলো বাজারে তেমন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারেনি। অন্যদিকে এই সফরেই ওয়াশিংটনকে তাইওয়ান ইস্যুতে সতর্ক করে দিয়েছে বেইজিং। সেই সঙ্গে ইরানকে ঘিরে যে যুদ্ধ চলছে, সেটি কখনোই শুরু হওয়া উচিত ছিল না বলেও স্পষ্ট অবস্থান নেয় শি জিনপিংয়ের সরকার।

২০১৭ সালের সফরের পর এবারই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট চীন সফর করলেন। ওই বছরও ডোনাল্ড ট্রাম্পই সবশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেইজিং সফর করেছিলেন।
তার এবারের পুরো সফরজুড়েও ছিল জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। চীনা সেনাদের সারিবদ্ধ কুচকাওয়াজ ও অভ্যর্থনা, বিলাসবহুল নৈশভোজ এবং টেম্পল হেভেনের মতো ইউনেস্কো ঘোষিত হেরিটেজ পরিদর্শনের মতো নানা আয়োজন উপভোগ করেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পও চীন সরকারের আতিথেয়তায় বারবার নিজের মুগ্ধতার কথা জানান। শি জিনপিংয়ের প্রশংসায়ও তাকে বারবার পঞ্চমুখ হতে দেখা যায়। শিয়ের আন্তরিকতা ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে মন্তব্যে ট্রাম্প জানান, তার (শি) বন্ধু হতে পেরে তিনি গর্বিত।
পরে তারা একসঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেন। সেখানে খাবারের তালিকায় ছিল লবস্টারের বল এবং কুং পাও স্ক্যালপস।
বিশ্লেষকরা ধারণা করছিলেন, ট্রাম্প ইরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চীনকে চাপ দেবেন। আবার অনেকে বলছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় বেইজিংয়ের জন্য তেহরান তুলনামূলক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় শি জিনপিং ইরানের ওপর কঠোর চাপ প্রয়োগ করবেন বা সামরিক সহায়তা বন্ধ করবেন- এমন সম্ভাবনা কম।
দুই নেতার বৃহস্পতিবারের বৈঠক নিয়ে হোয়াইট হাউসের সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের উপকূলসংলগ্ন হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে তারা অভিন্ন আগ্রহ দেখিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর চীনের নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের তেল কেনার ব্যাপারেও শি জিনপিং আগ্রহ দেখিয়েছেন বলে দাবি করেছে হোয়াইট হাউস।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিসিয়া কিম বলেন, ‘ট্রাম্পের চীন সফর থেকে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো- ইরানকে নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে চীনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিশ্রুতি আসেনি। এটি চীনের জন্য সফলতা তো বটেই, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যর্থতা না হলেও খুব সুখকর বার্তা নয়।’


