আজ সোমবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত তৃতীয় টার্মিনাল সচল করার সকল বাধা দূর হতে পারে। রাজস্ব ভাগাভাগি এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মেটাতে আজ সরকারি কর্মকর্তারা জাপানি কনসোর্টিয়ামের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসছেন।
বাণিজ্যিক শর্তাবলি নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে প্রায় ১৫ মাস ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে এই টার্মিনাল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই বিলম্বের কারণে ইতিমধ্যে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। একইসাথে প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের বিষয়টিও জটিল হয়ে পড়েছে।
এর আগে গত শুক্রবার এমবারকেশন ফি, অগ্রিম অর্থ প্রদান এবং রাজস্ব অংশীদারিত্বের মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে উভয় পক্ষ আলোচনায় বসেছিল। আজকের বৈঠকে এই সমস্যাগুলোর একটি স্থায়ী সমাধান আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আগের বৈঠকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত জাপানি কনসোর্টিয়ামকে বাংলাদেশের প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করে একটি সংশোধিত প্রস্তাব জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, কনসোর্টিয়ামটি তাদের প্রস্তাবনা হালনাগাদ করে আজ তা উপস্থাপন করবে।
জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আজকের বৈঠকে মন্ত্রণালয় ও বেবিচকের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। উভয় পক্ষ চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছে বলে জানা গেছে।
চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পর জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল, সুমিতোমো, সোজিৎজ এবং নারিতা এয়ারপোর্ট নিয়ে গঠিত জাপানি কনসোর্টিয়াম বাকি যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো স্থাপনের কাজ শেষ করবে। এতে আগামী ছয় মাস বা তারও কম সময়ের মধ্যে টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হবে।
২১ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই টার্মিনালটি প্রাথমিকভাবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চালুর কথা ছিল। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এই প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের ১৮ মাসের মেয়াদে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।
মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে, সে সময় একজন উপদেষ্টার পছন্দের একটি প্রতিষ্ঠানকে টার্মিনাল পরিচালনার কাজ দেওয়ার চেষ্টার ফলে প্রক্রিয়াটি আরও জটিল হয়ে উঠেছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর টার্মিনালের কাজ দ্রুত শেষ করার এবং বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করার নির্দেশ দেন। এর ফলে পুনরায় আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই প্রকল্পের আর্থিক গুরুত্ব অপরিসীম। বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান মফিদুর রহমান জানান, এই টার্মিনাল থেকে বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করা সম্ভব ছিল। কিন্তু দীর্ঘ বিলম্বের কারণে এখন অন্তত ৮ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা ঋণ পরিশোধের ওপর প্রভাব ফেলছে।
তিনি আরও বলেন, যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের উচ্চ সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বড় অংকের রাজস্ব আদায় এবং সেবার মান বাড়ানোর লক্ষ্য ছিল। বর্তমানে বিমানবন্দরের বিদ্যমান দুটি টার্মিনাল থেকে বছরে প্রায় ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা আয় হয়।
নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে বেবিচক আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন স্বতন্ত্র পরামর্শক নিয়োগ করেছে। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি) ট্রানজ্যাকশন অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করছে যারা যাত্রী সংখ্যা, বাণিজ্যিক আয় এবং মুনাফা অংশীদারিত্বের কাঠামো মূল্যায়ন করেছে। এর লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ এবং বেবিচকের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের খরচ নিশ্চিত করা।
মফিদুর রহমান যান্ত্রিক সমস্যার বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, অনেক যন্ত্রপাতির ওয়ারেন্টি ছিল দুই বছর যার মেয়াদ ২০২৪ সালের শুরুতে টার্মিনাল প্রস্তুত হওয়ার পর থেকেই শেষ হতে শুরু করেছে। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার না হলে এই মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
নতুন এই টার্মিনালটি চালু হলে বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ধারণ ক্ষমতা বিদ্যমান এক কোটি থেকে বেড়ে দুই কোটি ২০ লাখে উন্নীত হবে।
তবে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম রানওয়ের সীমাবদ্ধতা নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি জানান, রানওয়ের সক্ষমতা ইতিমধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন অতিরিক্ত ফ্লাইট যুক্ত করলে ফ্লাইটজট বাড়তে পারে। তবুও তিনি এই টার্মিনালটি দ্রুত চালু করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, বিলম্বের মাসুল অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে। তাই দ্রুত টার্মিনালটি চালু করা এখন সময়ের দাবি।


