নির্বাচনের মুখোমুখি হচ্ছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘ ১৭ বছরের কর্তৃত্বপরায়ন শাসন ও বিতর্কিত নির্বাচনী অভিজ্ঞতার পর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নতুন প্রজন্মের প্রজন্মের আন্দোলনে একটি পরিবর্তনের সূচনা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় দেশ শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি সংস্কারমূলক অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এসেছে, যার ম্যান্ডেট ছিল সংস্কার, বিচার ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন।
প্রায় দেড় বছর ধরে এই সরকার রাজনৈতিক সংস্কার, জবাবদিহিতামূলক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। এখন, সেই রূপান্তরকালীন যাত্রার চূড়ান্ত পরীক্ষা হলো ১২ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচন। প্রচার-প্রচারণা শেষ, দেশ এখন নীরব। কিন্তু এই নীরবতার আড়ালে সারা দেশে এক চাপা আতঙ্ক, উদ্বেগ ও প্রত্যাশার জটিল অনুভূতি কাজ করছে। মানুষ প্রশ্ন করছেন, এবার কি সত্যিই তাদের ভোটের মূল্য থাকবে? এবার কি জনগণের প্রকৃত রায় প্রতিফলিত হবে?
বাংলাদেশের অতীত নির্বাচনী ইতিহাস আমাদেরকে ভাবিয়েছে বারবার। কখনো নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে, কখনো সরকারের ভূমিকা নিয়ে, কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে, আবার কখনো রাজনৈতিক দলের ষড়যন্ত্র ও হিংসার কাহিনি নিয়ে গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হয়েছে। নির্বাচন হয়ে উঠেছে ‘এক পক্ষের জনরায়’ দখলের হাতিয়ার। এর ফলে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি-জনগণের আস্থা-ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
আজ, এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে, আমাদের সকলের-রাষ্ট্রযন্ত্র, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং সর্বোপরি সচেতন নাগরিক হিসেবে-একটি দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের দায়িত্ব হলো এই চক্র ভঙ্গ করা। ১২ ফেব্রুয়ারি শুধু ভোটগ্রহণের দিন নয়, এটি হবে আমাদের গণতান্ত্রিক পরিপক্কতারও দিনও।
নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও দৃঢ়তা নিয়ে কাজ করা। তাদেরকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে প্রতিটি ভোটই সুরক্ষিত হবে, গণনা হবে নির্ভুলভাবে এবং ফলাফল হবে জনগণের ইচ্ছার প্রকৃত প্রতিচ্ছবি।
সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো নির্বাচনের দিনে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও সহায়ক ভূমিকা পালন করা। নির্বাচনী পরিবেশকে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর রাখতে সকল প্রকার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ও ভীতি প্রদর্শন থেকে বিরত থাকা।
রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব অপরিসীম। তাদেরকে ফলাফল যাই হোক না কেন, গণতান্ত্রিক রীতি ও শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের চেতনাকে শ্রদ্ধা করতে হবে। জয়-পরাজয় গণতন্ত্রের নিয়মে হয়, কিন্তু জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাই হলো বৃহত্তর জাতীয় দায়িত্ব।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনো পক্ষের প্রতি আনুকূল্য না দেখিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
এবং সর্বোপরি, আমাদের, জনগণের দায়িত্ব হলো নির্ভয়ে, সচেতনভাবে ভোট দেয়া। আমাদের ভোটই হবে আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার হাতিয়ার।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই রূপান্তরকালীন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব হবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন এবং তার ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। এই হস্তান্তর কেবল সরকারি বাসভবনের চাবির হস্তান্তর নয়, এটি হবে গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থার পুনরুদ্ধার, একটি নতুন যুগের সূচনা।
আমরা আশা করি, আর মাত্র কয়েক ঘন্টা পর বৃহস্পতিবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে উদিত হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নতুন সূর্য। আমরা প্রত্যাশা করি, এই নির্বাচনই হবে সেই ইতিহাস, যেখানে জনগণের জয় হবে, ষড়যন্ত্রের পরাজয় হবে। দেশ এগিয়ে যাবে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথে।
শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং তারপর শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর-এই হোক আমাদের সকলের অঙ্গীকার। এই হোক আগামী দিনের বাংলাদেশের দৃঢ় প্রত্যয়। জয় হোক গণতন্ত্রের। জয় হোক জনগণের।


