সন্ধ্যা ৬টার দিকে, নগরীতে দিনের উজ্জ্বল আলো যখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে, তখন শহরের রাস্তায় এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একদল তরুণ-তরুণী খণ্ডকালীন কাজ হিসেবে, কাঁধে তুলে নেন ভারী কালো ব্যাকপ্যাক।
আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা আর সাধারণ পথচারী থাকেন না। তারা হয়ে ওঠেন চলন্ত মানব-স্ক্রিন। পিঠে বয়ে চলেন একটি এলইডি স্ক্রিন। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা শহরে মানুষের শরীরই যেন বিজ্ঞাপনের জায়গায় পরিণত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপনের এ ভাবনাটি অবশ্য একেবারে নতুন নয়। এলইডি আসার বহু আগে মানুষ শহরের রাস্তায় স্যান্ডউইচ বোর্ড গায়ে (বুকে-পিঠে) পরে বিজ্ঞাপন প্রচার করত। এটি বিজ্ঞাপনের প্রাচীনতম রূপগুলোর একটি। এই ধারার বিজ্ঞাপন মানুষের সামনে আসার অপেক্ষা করত না; বরং বিজ্ঞাপন নিজেই মানুষের কাছে চলে যেত। কয়েক দশক ধরে সেই বোর্ড আকারে ছোট হয়েছে, পরে ডিজিটাল হয়েছে, তারপর হয়েছে তারবিহীন।

সেই দীর্ঘ, নীরব বিবর্তনের কোনো এক পর্যায়ে কাঠের একটি বোর্ড বদলে গেছে জ্বলজ্বলে স্ক্রিনে। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য বদলায়নি: ‘মানুষ যদি বিজ্ঞাপন দেখতে না চায়, তবে বিজ্ঞাপনকেই মানুষের চোখের সামনে নিয়ে আসা হয়।’
দুবাই, লাগোস এবং ভারতের কিছু শহরেও এরই মধ্যে মানুষের বয়ে নিয়ে যাওয়ার মত এমন ডিজিটাল বিলবোর্ড দেখা গেছে। যেখানে স্থায়ী বিজ্ঞাপনের জায়গা অনেক ব্যয়বহুল অথবা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত, সেখানেএসব ডিজিটাল বিলবোর্ড কম খরচে বিজ্ঞাপনের বেশ ভালো বিকল্প। ঢাকায় অল্প খরচে বিজ্ঞাপনের এই নতুন সংস্করণটি কিছু পরে আসলেও নগরীতে এটি বেশ দ্রুত বেড়ে চলেছে। কারণ, এখানে এমন খোলা বিজ্ঞাপনের জায়গার চাহিদা অনেক বেশি।
তাই এখন ঢাকার স্থায়ী বিলবোর্ডগুলো ধীরে ধীরে তাদের প্রভাব হারাচ্ছে। তা ছাড়া কোথায় কোথায় প্রচলিত বিলবোর্ড বসানো যাবে, তা সীমিত করে দিয়েছে নগর কর্তৃপক্ষ। আর প্রতিদিন একই বিজ্ঞাপন দেখতে দেখতে নগরবাসী সেগুলো আর খেয়ালই করেন না। আর এই ঘটনাকে আক্ষরিক অর্থে প্রচারকারিরা বলেন ‘ব্যানার ব্লাইন্ডনেস’–অর্থাৎ বিজ্ঞাপন চোখের সামনে থাকলেও মস্তিষ্ক সেটিকে আর গুরুত্ব দেয় না।

এই বাস্তবতায় মানুষের বয়ে নিয়ে যাওয়া চলমান স্ক্রিন বিজ্ঞাপনের চিরাচরিত একঘেয়েমি থেকে বেশ আলাদা। চলমান বিজ্ঞাপন নিয়ে সামনে এসে দাঁরানো মানুষটি চাইলে, আপনার দিকে তাকিয়ে একটু হাসতেও পারেন, যা আপনার মনোযোগ কাড়তে বাধ্য। এমন কাজ তো আর রাস্তার পাশের স্থির বিলবোর্ডটি করতে পারবে না। এখনকার চলমান বিজ্ঞাপনের আরেকটি সুবিধা হলো–এটি তুলনামূলক সস্তা। বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে, একটি স্ক্রিন এক সপ্তাহ চালানোর জন্য প্রায় ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়, যা গুলশানের কোনো প্রিমিয়াম স্থায়ী বিজ্ঞাপনের জায়গার এক মাসের খরচের তুলনায় অনেক কম।
আর এই বিজ্ঞাপনের পুরো কার্যক্রম প্রক্রিয়া বেশ নাটকীয়। একজন তরুণ কর্মী বা উদ্যোক্তা এ ধরনের বিজ্ঞাপন নিয়ে কাজ করতে গেলে, একটু ভিড় দেখে কোনো জায়গায় গিয়ে দাঁড়ান। এ সময় তার পিঠের স্ক্রিনটি জ্বলে ওঠে, আর তিনি সেখানেই কিছু সময় কাটান। এরপর হয়তো কোনো চায়ের দোকানের পাশে থামেন, অপরিচিত কারও প্রশ্নের উত্তর দেন কিংবা কাউকে ফোন বের করে সেই আলোতে ছবিও তুলতে দেন।
আর এভাবেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শত শত কৌতূহলী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। তাদের মধ্যে আবার কেউ কেউ কিউআর কোডও স্ক্যান করেন।

সাধারণত বিকাল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এমন বিজ্ঞাপন প্রচারের কাজ চলে। কারণ, সন্ধ্যার এই ব্যস্ত সময়ে ফুটপাতগুলো মানুষের ভিড়ে ভরে যায়। আর এই সময়েই আকাশের আলো এমন রঙ ধারণ করে, যার সামনে একটি জ্বলজ্বলে স্ক্রিনকে উপেক্ষা করা কঠিন।
তরুণ কর্মীদের কাছে অবশ্য এই কাজ খুবই সাধারণ। এই কাজে খাটুনিও অপেক্ষাকৃত কম এবং মোটামুটি ভালো পকেটমানিও পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে কিছুটা পথনাটকের অভিজ্ঞতা এই কাজের বাড়তি সংযোজন। তুরুণরা এই কাজ করতে করতেই রিকশাচালকদের সঙ্গে কথা বলেন, কৌতূহলী কিশোরদের সঙ্গে মজা করেন, আর কখনো কখনো মানুষকে বিজ্ঞাপনটি উপভোগের সুযোগ করে দেন।
কোনো পথ ধরে মানুষের পিঠে থাকা চলতি স্ক্রিনগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকলে রাস্তাটিকে কোনো সিনেমার সেট বলে মনে হতে শুরু করে। সেই পথেই হঠাৎ চলমান বিজ্ঞাপনের পর্দাগুলোর পাশ দিয়ে শব্দ তুলে চলে যায় একটি রিকশা। সেই রিকশার চাকা হয়ত এই পথের ভিডিও ধারণ করতে থাকা ফোনগুলোর চেয়েও পুরোনো।
একই ফুটপাথে তখন মুখোমুখি হয় ঢাকার দুটি সময়।
যার একটি শহরের বহু পুরোনো ছন্দে পুরোনো, ধুলোমাখা, অ্যানালগ চাকা নিয়ে ঘুরছে।
অন্যটি নতুন, উজ্জ্বল, ডিজিটাল পথে নিজস্ব আলো নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ভবিষ্যতের দিকে।
এক মুহূর্তের জন্য এই দৃশ্যটি দেখতে ‘ব্লেড রানার ২০৪৯’ সিনেমার মত মনে হয়। তবে এই সিনেমার সঙ্গে এই দৃশ্যের পার্থক্য হলো, চলমান সেই নীয়ন আলো কোনো ভবনের গায়ে লাগানো না। এই আলো সঙ্গে নিয়ে চলা অবয়বগুলো শ্বাস নেয়, ক্লান্ত হয় এবং তাদেরও বাড়ি ফেরার বাস ধরার তাড়া থাকে।

তবে, নতুনভাবে বিজ্ঞাপন প্রচারের এই আয়োজনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে থাকে। অল্প একটু জমির জন্য যে শহরে এত প্রতিযোগিতা, সেখানে আসলে মানুষের শরীরই কি আসলে ভাড়া দেওয়ার জন্য অবশিষ্ট থাকা শেষ বিলবোর্ড?
ঢাকায় এখন প্রায়ই চোখে পড়া এমন বিজ্ঞাপনগুলোকে আপনি ঠিক খারাপও বলতে পারবেন না। কারণ এই কাজ করতে কাউকে জোর করা হচ্ছে না, কাজটি বৈধ, পারিশ্রমিকও খারাপ না, আবার এতে দর্শকরাও সত্যিই বিনোদিত হচ্ছেন।
কিন্তু আদতে একটু দূর থেকে পুরো ছবিটাকে ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করলে আমাদের চোখের সামনের দৃশ্যপট বদলে যায়।
ব্যাকপ্যাক, হাসি, আর নিজের পিঠে প্রতিদিন পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলতে থাকা বিজ্ঞাপনের কাজ করতে গিয়ে কর্মী নিজেই সেই কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন।

এভাবে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামে। ভিড় কমে আসে, চলতি পথের মোড়গুলোতে আলো ম্লান হয়ে যায়। আর এই কাজে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরাও বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করেন–তখন সঙ্গে থাকে শুধু নিজেদের ছায়া।
পরদিন বিকাল চারটায় আবার স্ক্রিনগুলো জ্বলে উঠবে। আবার কোনো ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়াবে একজন মানুষ—নিজের শরীরকে পরিণত করবেন বিজ্ঞাপনের পর্দায়।
আর এই শহর একটির পর একটি চলন্ত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিজেকেই বিক্রি হতে দেখতে থাকবে।


