প্রবাসে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে ‘লেখকের অঙ্গন’-এর ২৯তম গ্রন্থালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সম্প্রতি নিউইয়র্কের কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরিতে সাহিত্যপ্রেমী, কবি, লেখক ও পাঠকদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে এ সাহিত্যসভা অনুষ্ঠিত হয়। বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শহীদ কাদরীর সাহিত্যভাবনাকে ধারণ করে ‘লেখকের অঙ্গন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক নীরা কাদরী দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চার এক অনন্য পরিমণ্ডল গড়ে তুলেছেন।
তার উদ্যোগে নবীন ও প্রবীণ লেখকদের মধ্যে বইপাঠ, গ্রন্থালোচনা ও সাহিত্যবিষয়ক মুক্ত মতবিনিময়ের মাধ্যমে একটি সৃজনশীল সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে, যা বাংলা সাহিত্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
সভায় প্রথমে লেখক ও গবেষক আহমাদ মাযহার আলোচনা করেন আবুল আহসান চৌধুরীর বই ‘বুদ্ধির মুক্তির আন্দোলন, শত বর্ষের সমীক্ষণ’ গ্রন্থটি নিয়ে। গ্রন্থটিতে বাঙালি সমাজে যুক্তিবাদ, মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। শত বছরের ধারাবাহিকতায় বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্বের অবদান এতে আলোচিত হয়েছে। পাশাপাশি বাঙালি মুসলিম সমাজের বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। সমাজ ও সংস্কারের ক্ষেত্রে মুক্তবুদ্ধির প্রয়োজনীয়তাও বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। আলোচক গ্রন্থটির ঐতিহাসিক ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা সুন্দরভাবে তুলে ধরেন।
এরপর কবি ও সাবেক ব্যাংকার মোহাম্মদ মহিবুর রহমান আলোচনা করেন সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ থেকে নির্বাচিত তিনটি গল্প- ‘চাচা কাহিনী’, ‘বিষের বিষ’ এবং ‘বেঁচে থাকো সর্দি-কাশি’। গল্পগুলোতে লেখকের রসবোধ, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও মানবজীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
দেশ-বিদেশের সংস্কৃতি, মানুষ ও সম্পর্কের নানা দিক তার গল্পে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। আলোচনায় সৈয়দ মুজতবা আলীর স্বতন্ত্র কথনশৈলী ও বাংলা সাহিত্যে তার বিশেষ অবস্থান তুলে ধরা হয়।
লেখক ও গবেষক ওবায়দুল্লাহ মামুন আলোচনা করেন শ্রী খগেন্দ্রনাথ ভৌমিকের বই ‘বেদ ও মনুসংহিতায় অনুশাসনের যুক্তি নির্ভর পর্যালোচনায় মানব সংহিতা’। গ্রন্থটিতে বেদ ও মনুসংহিতার বিভিন্ন অনুশাসনকে যুক্তি ও বিশ্লেষণের আলোকে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
প্রাচীন শাস্ত্রীয় বিধান ও মানবিক মূল্যবোধের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আলোচক গ্রন্থটির গবেষণামূলক গুরুত্ব, বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যতা ও প্রাসঙ্গিকতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
এরপর মমতাজ বেগম সুমি আলোচনা করেন টেকচাঁদ ঠাকুরের বই ‘আলালের ঘরের দুলাল’। বাংলা গদ্য ও উপন্যাসের বিকাশে এই গ্রন্থের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। তৎকালীন সমাজ, জীবনযাপন, শিক্ষা এবং বিভিন্ন সামাজিক অসংগতি ব্যঙ্গ ও রসের মাধ্যমে গ্রন্থটিতে তুলে ধরা হয়েছে। আলোচক গ্রন্থটির সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য, সমাজচিত্র এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা করেন।
সবশেষে আরিফ মাহমুদ শৈবাল আলোচনা করেন অ্যাডাম স্মিথের বিখ্যাত অর্থনীতির বই ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশন’ নিয়ে। গ্রন্থটিতে শ্রমবিভাজন, উৎপাদন, বাজারব্যবস্থা, সম্পদ সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আধুনিক অর্থনৈতিক চিন্তার বিকাশে গ্রন্থটির ভূমিকা এবং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচক বইটির আলোকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন।
শেষে সঞ্চালক নীরা কাদরী কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরি ম্যানেজার শান্তে গেইন্সসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।


