সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস থাকলেও দেশবাসীকে চলতি বছর গরমের পুরোটা সময় লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা সহ্য করতে হতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা সর্বোচ্চ চাহিদার দেড় গুণের বেশি হলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করতে না পারাই সেটি পূরণ করতে না পারার প্রধান কারণ।
মে মাসের একটি বড় সময় ঝড় বৃষ্টিতে বিদ্যুতের চাহিদা কমায় দেশের মানুষ স্বস্তিতে থাকলেও গরম বাড়লেই বিদ্যুতের যাওয়া আসা নিয়মিত ঘটনা হয়ে যায়। তীব্র গরমের মধ্যে এপ্রিলের প্রায় পুরোটা সময় ঢাকার বাইরে, বিশেষ করে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে মানুষকে।
বিদ্যুৎ সরবরাহের দুই প্রধান সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ উৎপাদন ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে একদিনই। তাও এখনও বিভিন্ন জেলা শহরাঞ্চলে এলাকাভেদে দিনে দুই থেকে ৬ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, গ্রামে বিদ্যুতের যাওয়া আসা ঘণ্টায় ঘণ্টায়।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘জ্বালানি সরবরাহ সীমিত থাকলে উৎপাদন বাড়ানো যায় না। এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন এবং কয়লা আমদানিতে কিছু জটিলতার কারণে আগে উৎপাদন কমে গিয়েছিল। এখন পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে, গত এক সপ্তাহে বেশিরভাগ কেন্দ্র চালু হয়েছে।’
তিনি জানান, ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক উৎপাদন সীমিত রাখায় পুরো সক্ষমতায় উৎপাদন নেওয়া যাচ্ছে না। তবে জ্বালানি সরবরাহ বাড়লে দ্রুতই উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
গ্যাস ও তরল জ্বালানি আমদানির দায়িত্বে রয়েছে পেট্রোবাংলা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানিতে বিলম্ব বা বিঘ্ন ঘটলে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনে তার প্রভাব পড়ে, ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়।
জ্বালানি খাত নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা সিনিয়র সাংবাদিক অরুণ কর্মকার বলেন, ‘এটা প্রযুক্তিগত সংকট নয়–পুরোপুরি জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা। গ্যাসভিত্তিক সক্ষমতা থাকলেও গ্যাস নেই, কয়লা সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর, আর ফার্নেস অয়েল ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বেসরকারি খাত মোট বিদ্যুতের বড় অংশ উৎপাদন করে, যার প্রধান জ্বালানি ফার্নেস অয়েল। অন্যদিকে বড় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো আমদানির ওপর নির্ভরশীল, আর দেশীয় কয়লার উৎসও সীমিত। ফলে গ্যাস, কয়লা ও তেল–সব ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধতা বিদ্যুৎ খাতকে কাঠামোগত চাপের মধ্যে ফেলেছে।’
গ্যাস সংকটই বর্তমানে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করছে বিদ্যুৎ খাতে। ১২ হাজার মেগাওয়াটেরও কিছু বেশি উৎপাদন সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থাকলেও সরবরাহ ঘাটতির কারণে ৫ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। অর্থাৎ গ্যাসের অভাবে সক্ষমতার অর্ধেকও কাজে লাগানো যায়নি।
দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ার বদলে কমে আসা, আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট মার্কেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে চাইলেই গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো যাচেআছ না।
সরকারের হিসাবে দেশের সব গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে দৈনিক ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও সরবরাহ ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যেই উঠানামা করে।
এপ্রিলের শেষে বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্মসচিব উম্মে রেহানা আক্ষেপ করে বলেন, ১ হাজার ২০০ এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়া গেলে ৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী মূল্যে উৎপাদন সম্ভব হতো।
২০২৪ সালের এপ্রিলেও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ ছিল ১৩৫ কোটি ঘনফুট।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশের মোট ৪৯টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৯টি জ্বালানি সংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে। এছাড়া যান্ত্রিক ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ রয়েছে আরও ৬টি কেন্দ্র।
তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও একই রকম। মোট ৫৪টি তেলভিত্তিক কেন্দ্রের মধ্যে ৭টিতে জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে আরও একটি।
তেলভিত্তিক ডিজেল চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জরুরি পরিস্থিতির জন্য রাখা আছে। এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেশি, যে কারণে বিশেষ সময় ছাড়া সেগুলো চালু করা হয়নি। ফার্নেস অয়েলের কেন্দ্রগুলোও যতটা কম পারা যায়, সে চেষ্টা করে বিদ্যুৎবিভাগ।
এক সময় সমলোচনা থাকলেও এখন দেশের ভরসা হয়ে উঠেছে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। এখন গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এই কেন্দ্রগুলো। তবে এখানেও উৎপাদন আরও বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
দেশে স্থাপিত কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে মোট উৎপাদনক্ষমতা ৭ হাজার ৬২৯ মেগাওয়াট, যা দেশের মোট উৎপাদন ক্ষমতার ২৭ শতাংশ। তবে এপ্রিলের শেষের দিকে একদিন সর্বোচ্চ ৫ হাজার ১৮৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে।
দেশে অন্যদিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা মোট আটটি। এর মধ্যে একটি সম্পূর্ণ বন্ধ রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে। তবে শঙ্কা রয়ে গেছে। কেন্দ্রগুলোও পুরোপুরি নির্ভর করছে কয়লা আমদানির ওপর। পায়রা, রামপাল ও চট্টগ্রামের এস আলমসহ বড় কেন্দ্রগুলোতে জাহাজে কয়লা আসা এবং মজুদ শেষ হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
দেশীয় উৎস বড়পুকুরিয়া কেন্দ্র থেকেও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন হচ্ছে না। প্রায় ৫২৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে বর্তমানে ১০০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
এর মধ্যে রূপপুরের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের পূর্ণ সুবিধাও গরমের মৌসুমে পাওয়া যাবে না। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শেষ হলেও বিদ্যুৎ পেতে পেতে আগস্ট লেগে যাবে। তবে প্রথমে পাওয়া যাবে ৩০০ মেগাওয়াট।
কেন্দ্রটি থেকে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বা ২০২৭ সালের প্রথমভাগে পূর্ণ সক্ষমতায় অর্থাৎ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা আছে। ততক্ষণে শীত চলে আসবে এবং বিদ্যুতের চাহিদা কমে দেশ বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত অবস্থায় চলে যাবে।


