তামাকের বিষাক্ত চাদরে ঢাকা পড়েছে এক সময়ের শস্যভাণ্ডার লালমনিরহাট জেলা। ধান, ভুট্টা, আলু আর শাকসবজির সবুজ মাঠ এখন ধূসর তামাকের দখলে। তামাক কোম্পানিগুলোর চটকদার প্রলোভন আর উপকরণ ও ঋণ সুবিধার ফাঁদে পড়ে কৃষকরা ঝুঁকছেন এই মরণঘাতী চাষে। এতে একদিকে যেমন জমির উর্বরতা কমছে, অন্যদিকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে শিশুসহ সাধারণ মানুষ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলায় মোট ১৮ হাজার ২২৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় দুই হাজার ৬৫০ হেক্টর বেশি।
তবে বেসরকারি জরিপ বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, তামাক চাষের প্রকৃত পরিমাণ ২৪ হাজার হেক্টর ছাড়িয়ে গেছে। জেলার ৪৫টি ইউনিয়নের সবকটিতেই এখন বিষাক্ত এই পাতার আধিপত্য।
সরেজমিনে দেখা গেছে, তিস্তা, ধরলা, রত্নাই, স্বর্ণামতিসহ জেলার নদ-নদী গুলোর তীরে এখন সবজির বদলে তামাকের রাজত্ব। বর্ষায় জমা পলিতে যেখানে প্রচুর ফসল হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তামাক চাষের বিষাক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক নদীর পানি দূষিত করছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে মাছের প্রজনন, চরম হুমকির মুখে পড়ছে জলজ প্রাণবৈচিত্র্য।
স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দেশি-বিদেশি সিগারেট কোম্পানিগুলো বিনামূল্যে বীজ, সার ও বিনা সুদে ঋণ প্রদানসহ বিক্রির নিশ্চয়তা দিয়ে কৃষকদের তামাক চাষে উৎসাহিত করে আসছে। পুঁজিহীন ব্যবসা এবং বেশি মুনাফার আশায় এ অঞ্চলের কৃষকরাও এই আত্মঘাতী তামাক চাষে জড়িয়ে পড়ছেন।
তামাক চাষ ও পাতা শুকানোর প্রক্রিয়ায় নারী ও শিশুশ্রম ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে এলাকায় শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। লালমনিরহাটের সিভিল সার্জন ডাঃ আব্দুল হাকিম জানান, তামাকের প্রভাবে এলাকায় শ্বাসকষ্ট, স্ট্রোক, চর্মরোগ এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে পরোক্ষ প্রভাবে শিশু ও গর্ভবতী নারীরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. মোঃ সাইখুল আরিফিন জানান, কৃষি অফিস সভা, সেমিনার ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে কৃষকদের তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করে। কিন্তু তামাক কোম্পানিগুলোর ঋণ সহায়তা ও বেশি মুনাফার আকর্ষণে কৃষকরা কৃষি অফিসের পরামর্শ উপেক্ষা করে তামাক চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক চাষে জমির উর্বরতা শক্তি দীর্ঘমেয়াদে নষ্ট হয়ে যায়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে এখনই কঠোর নীতিমালা এবং তামাকের বিকল্প লাভজনক ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা জরুরি। সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে লালমনিরহাটের কৃষি ও জনস্বাস্থ্য।


