দেশে আমদানি করা মোট জ্বালানির ৬৩ শতাংশই পুড়ে যাচ্ছে পরিবহন খাতে, যার প্রায় পুরোটাই জীবাশ্ম জ্বালানি। বাংলাদেশ যদি এখনই না থামে, তাহলে ২০৪১ সালে মাত্র একটি খাতেই, মোটরসাইকেল সংখ্যা গিয়ে ঠেকবে দুই কোটিতে। সেই সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ি ৩৬ লাখ। অথচ আজও ঢাকার ৬০ ভাগ রাস্তার প্রস্থ ১০ ফুটের কম।
শনিবার বৃহস্পতিবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)।
‘জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই পরিবহন ও যোগাযোগ’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় আঘাত বাংলাদেশে প্রথমে পড়বে পরিবহন খাতেই এবং সেই আঘাত সামলানোর কোনো প্রস্তুতি এখনো নেই।
পুরো জ্বালানি একটি খাতের জিম্মায়
বাংলাদেশ পেট্রলিয়াম করপোরেশনের তথ্য উদ্ধৃত করে বিআইপির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, দেশে আমদানিকৃত জ্বালানির ৯৮ শতাংশই পেট্রল, অকটেন, ডিজেল ও কেরোসিন। সংস্থাটির বার্ষিক সংরক্ষণ ক্ষমতা ১৫ লাখ ৭০ হাজার টন, তার মধ্যে ৬৩ শতাংশ যায় পরিবহন খাতে, ১৫ শতাংশ কৃষিতে, ১২ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে এবং মাত্র ৬ শতাংশ শিল্পে।
পরিবহন খাতে ব্যবহৃত জ্বালানির মধ্যে আবার ৬৩ শতাংশই ডিজেল, ১৪ শতাংশ ফার্নেস অয়েল, এবং পেট্রল ও অকটেন মাত্র ৬ শতাংশ করে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বৈশ্বিকভাবে কার্বন নিঃসরণের সবচেয়ে বড় উৎস বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত, সেটি দ্বিতীয় বৃহত্তম পরিবহন খাত। কিন্তু বাংলাদেশে জ্বালানির সবচেয়ে বড় ভোক্তাই হলো পরিবহন। ফলে যেকোনো বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রথম ধাক্কা এ দেশে এসে লাগে পরিবহনেই।
দশ বছরে মোটরসাইকেল বেড়েছে আড়াই গুণ
২০১৫-১৬ সালে দেশে নিবন্ধিত যানবাহন ছিল প্রায় ৩০ লাখ। ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৭ লাখ ৬০ হাজারে। এই বৃদ্ধির সিংহভাগই মোটরসাইকেল, সারা দেশে বেড়েছে আড়াই গুণ ও ঢাকায় দ্বিগুণ।
১০ বছর আগেও মোটরসাইকেল ছিল মোট যানবাহনের ৬০ শতাংশ, এখন তা আরও বেশি।
‘এই হার যদি অব্যাহত থাকে, ২০৪০-৪১ সালে মোটরসাইকেলের সংখ্যা হবে ২ কোটি। এখন ৪১ লাখ মোটরসাইকেলই আমরা ম্যানেজ করতে পারছি না। যানজট বলুন, দুর্ঘটনা বলুন, জ্বালানি বলুন। ২ কোটি হলে কী হবে সেটা এখনই ভাবা উচিত,’ বলেন মোস্তাফিজুর রহমান।
ঢাকার সাম্প্রতিক জরিপ আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। ২০১৩ থেকে ২০২৩, মাত্র ১০ বছরে ঢাকায় ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার বেড়েছে ৩৩ শতাংশ, সিএনজি ১২৫ শতাংশ এবং মোটরসাইকেল বেড়েছে ৫০৬ শতাংশ। একই সময়ে গণপরিবহনের ব্যবহার ২১ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৮ শতাংশে।

মেট্রোরেল এল, তবু বদলায়নি চিত্র
মেট্রোরেল দৈনিক প্রায় ৪ লাখ যাত্রী নিয়ে ট্রিপ পরিচালনা করছে, যা মোট মোটরাইজড ট্রিপের মাত্র ১-২ শতাংশ। ফলে গণপরিবহনের হার ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ১০-১১ শতাংশে ঠেকেছে মাত্র।
অথচ ১৯৭৫ সালে দেশের মোট যাত্রী পরিবহনে রেলের অংশ ছিল ৩০ শতাংশ। ৫০ বছর পরে সেটি নেমে এসেছে ৩ শতাংশের নিচে। নৌপথেও একই অবস্থা। ১৬ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৮ শতাংশে। অন্যদিকে, সড়ক পথে যাত্রী পরিবহন ৫৪ শতাংশ থেকে লাফ দিয়ে ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের বেঞ্চমার্কই ছিল ২০১৩ সালের গণপরিবহন ব্যবহারের হার। সেটাও আমরা আর ধরে রাখতে পারছি না।’
মিরপুর রোডের এক তথ্যই বলে দেয় সব
বিআইপির গবেষণায় উঠে এসেছে এমন একটি তথ্য, যা নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতার পুরো গল্পটাই বলে দেয়।
মিরপুর রোডে ব্যক্তিগত গাড়ি দখল করছে ৭৩ শতাংশ জায়গা, বহন করছে ২৪ শতাংশ যাত্রী। আর বাস দখল করছে মাত্র এক শতাংশ জায়গা, বহন করছে ৬২ শতাংশ যাত্রী।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘একটি গাড়ি কার বানাতে যত যন্ত্রাংশ লাগে, তা দিয়ে ১৫০টি সাইকেল তৈরি করা যায়। এই হিসাবটা ১৯৪২ সালে যেমন সত্য ছিল, আজও ততটাই সত্য।’
২০০৪ সালের লক্ষ্যমাত্রা ছিলই ভুল
বিআইপি জানায়, জাতীয় ভূমি পরিবহন নীতি ২০০৪-এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, ২০২২ সালের মধ্যে ঢাকার মোট মোটরাইজড ট্রিপের অর্ধেক হবে কার-ভিত্তিক ট্রিপ। অর্থাৎ সরকারিভাবেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল ব্যক্তিগত গাড়ির আধিপত্যকে স্বীকার করে নেওয়ার।
তিনি বলেন, সৌভাগ্যক্রমে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। ২০ বছরে কিছুই না করার পরেও কার-ভিত্তিক ট্রিপ মোট মোটরাইজড ট্রিপের ৩৭ শতাংশে আটকে আছে। যদি সেই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৫০ শতাংশ হতো, আজ কী পরিস্থিতি হতো ভাবুন।
ইলেকট্রিক কার নয়, ইলেকট্রিক বাস চাই
ইলেকট্রিক গাড়ি নিয়ে যে উৎসাহ তৈরি হচ্ছে, তাতে সতর্কবার্তা দিয়েছে বিআইপি। সংস্থাটি বলছে, ইলেকট্রিক কার তৈরির সময় যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়, তা একবারেই হয়ে যায়, চলার সময় কম হলেও ক্ষতি ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে। উপরন্তু একটি কার যে পরিমাণ জায়গা দখল করে, সেই তুলনায় যাত্রী বহন করে অনেক কম।
তিনি বলেন, ‘সবাই যদি ইলেকট্রিক কার কেনেন, তাহলে রাস্তা চওড়া করতে হবে, আর রাস্তা চওড়া করতে গেলে আরও বেশি কার আসবে। এই চক্র থেকে বের হওয়ার একটাই পথ: ইলেকট্রিক বাস, ইলেকট্রিক বিআরটি, ইলেকট্রিক মেট্রো।’
বিআইপির সুপারিশ
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপি ২০টির বেশি সুপারিশ উপস্থাপন করেছে। সবচেয়ে জরুরি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে
সরকার থেকে সরকার চুক্তিতে আগামী ২-৩ মাসের মধ্যে ঢাকায় ৫০০ থেকে ১ হাজার বাস নামানো; গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পের অব্যবহৃত প্রায় ১ হাজার কোটি টাকায় ১৩৭টি বাস কিনে ৬ মাসের মধ্যে পরিষেবা চালু করা; ঢাকার ৯০টি ওয়ার্ডে প্রতিটিতে গড়ে ১ হাজার করে মোট ১ লাখ সাইকেল শেয়ারিং স্কিম চালু করা, যেখানে প্রতিটি সাইকেলের দাম ১৫ হাজার টাকা ধরলেও মোট খরচ মেট্রোরেলের তুলনায় নগণ্য; চট্টগ্রামসহ আরও ৬টি শহরে অবিলম্বে বিআরটি চালু; এবং কার, মোটরসাইকেল ও এর যন্ত্রাংশে কর বাড়িয়ে সেই অর্থ সরাসরি জাতীয় নগর পরিবহন তহবিলে জমা রাখা।
মন্ত্রী-সচিবদের গাড়ি তুলে দেওয়ার দাবি
সংবাদ সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত দাবিটি এল একেবারে শেষে। বিআইপি সরাসরি দাবি করেছে, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও উচ্চপদস্থ সকল সরকারি কর্মকর্তার জন্য বরাদ্দকৃত ২৭০০ সিসির পাজেরো বাদ দিয়ে মিনিবাস বরাদ্দ করা হোক।
সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য যে ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে, এ পর্যন্ত যা প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে, তা বন্ধ করে সেই অর্থ দিয়ে বাস কেনার দাবি জানানো হয়।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘যে দেশে ধনীরা বাস চড়েন, সেটাই উন্নত দেশ, গরিবের গাড়ি থাকলে উন্নত হয় না। বোগোটার সাবেক মেয়র এনরিক পেনিলোসার এই কথা আজ সত্য হয়ে উঠছে পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে।’
বিআইপি সভাপতি আরিফুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পরিবহন পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বিকেন্দ্রীভূত নগর কাঠামো এবং গণপরিবহনভিত্তিক সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়া বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট দীর্ঘমেয়াদে কোনোভাবেই সমাধানযোগ্য নয়।


