‘আমার টেলিপ্রম্পটার কাজ করছে না। এস্কেলেটরও ভাঙা ছিল।’ ঠিক এভাবেই জাতিসংঘকে ‘অকার্যকর ও অর্থহীন’ কটূক্তি করে সাধারণ অধিবেশনের ভাষণ শুরু করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানান, টেলিপ্রম্পটার (লিখিত ভাষণ পড়ার যন্ত্র) নষ্ট হয়ে বরং ভালোই হয়েছে। সহযোগীর লেখা বক্তব্য পড়ার চেয়ে নিজের হৃদয় থেকে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন।
জাতিসংঘকে ব্যঙ্গ করে তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘ থেকে আমি পেয়েছি দুটি জিনিস। একটি ভাঙা এস্কেলেটর (চলন্ত সিঁড়ি) এবং একটি ভাঙা টেলিপ্রম্পটার।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘এগুলো ছাড়া জাতিসংঘ আসলে কী অর্জন করছে? জাতিসংঘ শুধু কড়া ভাষায় চিঠি লিখতে পারে। এর বাইরে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে না।’
সিএনএনের খবরে বলা হয়, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে ট্রাম্পের কণ্ঠে স্পষ্ট অস্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে। তিনি টেলিপ্রম্পটার বিকল হওয়ার দায় জাতিসংঘের ওপর চাপাতে চাইলেও, স্পষ্টতই জাতিসংঘের যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের ভার হোয়াইট হাউসের ওপর বর্তায়। কাজেই এ অভিযোগ কেবল সংস্থাটিকে ব্যর্থ প্রমাণের প্রচেষ্টা মাত্র।

মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর বর্ধিত শুল্ক, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সীমান্ত দ্বন্দ্ব, মিত্র হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক দূরত্ব, অভিবাসী সংকটসহ নানা বিষয়ে আলোকপাত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
জাতিসংঘের প্রায় দেড়শো সদস্য দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে ইসরায়েলের প্রতি বন্ধুত্বের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে হামাসকে পুরস্কৃত করা।’ গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ সহজ হবে মনে করলেও এখন তা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে স্বীকার করে নেন এই মার্কিন নেতা।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার ‘ভালো সম্পর্ক’ যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টায় কোনো কাজে দেয়নি জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে ইউরোপীয় দেশ, ভারত ও চীন দায়ী। তারা মস্কোর জ্বালানি তেল কেনা অব্যাহত রাখার মাধ্যমে যুদ্ধের জন্য অর্থের যোগান দিয়ে যাচ্ছেন।’ এ সময় রাশিয়া থেকে অবিলম্বে সব ধরনের জ্বালানি কেনা বন্ধের আহ্বান জানান ট্রাম্প।
ট্রাম্প তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পররাষ্ট্র নীতির জন্য মিত্র দেশগুলোকেই সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইউরোপ ও পশ্চিমা দেশগুলো অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের মাধ্যমে নিজেদের দেশ ধ্বংস করছে।

তিনি দাবি করেন, জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রণের বদলে পশ্চিমা দেশগুলোতে অভিবাসন বাড়াতে অর্থ ব্যয় করছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ায় অভিবাসীর প্রবাহ কমে গেছে এবং ইউরোপসহ অন্যদেরও একই নীতি গ্রহণ করা উচিত।
জলবায়ু পরিবর্তনকেও তীব্রভাবে ‘অস্বীকার’ করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ভীতি দেখানো ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতারণা’। তিনি জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থার ‘বৈশ্বিক উষ্ণতা’ সংক্রান্ত পূর্বাভাসকে ‘ভুল এবং বোকা মানুষের কাজ’ বলেও অভিহিত করেন।
‘পরিবেশবান্ধব জ্বালানি’ উন্নত দেশগুলোর শিল্পায়ন ধ্বংসের জন্য দায়ী বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করে অন্য দেশ লাভবান হলেও যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়ছে উল্লেখ করেন ট্রাম্প।
নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে চলা বক্তৃতায় ট্রাম্প মূলত নিজের কৃতিত্ব তুলে ধরেন এবং বিশ্ব নেতাদের তিরস্কার করেন। জাতিসংঘে তার প্রথম মেয়াদের ভাষণে শ্রোতারা হাসিতে ফেটে পড়লেও এবারের ভাষণের সময় পরিবেশ ছিল থমথমে। এর পেছনেও ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী অবস্থানকে দায়ী করেন বিশ্লেষকরা।


