জাতীয় নির্বাচনেরে আগেভাগে লটারির মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলায় পুলিশ সুপার (এসপি) নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ন ও দায়িত্ব প্রদানে এমন ব্যবস্থা বিশ্বজুড়েই প্রথম। তবে এটি শুধু নিয়োগ-বদলির প্রশাসনিক পরীক্ষা নয়, বরং এটি দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তা-ই প্রকাশ করে।
কর্মকর্তারা বলছেন, লটারির উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতাসীন দলগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাচনের আগে নিজেদের অনুকূলে পরিবেশ তৈরি করতে পুলিশের পোস্টিংয়ে প্রভাব ফেলার অভিযোগ রয়েছে। লটারি ব্যবস্থায় সেই প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকছে না।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারি বাসভবন যমুনায় গত রোববার রাতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে হাতে হাতে এই লটারি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে একটি পরিষ্কার বার্তা দিতে চাইছে, এখন থেকে আর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নির্বাচনী পরিস্থিতি প্রভাবিত করতে দেওয়া হবে না।
কিন্তু এই লটারির প্রয়োজনীয়তাই প্রমাণ করে, দেশের প্রচলিত চেইন অব কমান্ড এবং প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়াগুলো তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, কেবল একটি ভাগ্যের দৌলতে পাওয়া সুযোগ নিরপেক্ষ ফলাফল দিতে সক্ষম বলে মনে করা হচ্ছে।
অবশ্য এই মুহূর্তটি একদিনে আসেনি। এটি কয়েক দশক ধরে তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সরকারগুলো তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য পুলিশকে ব্যবহার করার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে। সরকারি দলের প্রতি বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের ভালো পোস্টিং দেওয়া হয়েছে, আর নিরপেক্ষ থাকতে চাওয়া কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়েছেন। বিশেষ করে নির্বাচনের সময়ে বেছে বেছে আইন প্রয়োগ, যথেচ্ছ গ্রেপ্তার এবং বিরোধী দলের সমাবেশে কঠোর আচরণের অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার বলেছে যে, পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু এবং অতিরিক্ত বল প্রয়োগ একটি এমন ব্যবস্থার লক্ষণ, যেখানে স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা নেই।
নিয়োগ এবং পদোন্নতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান না থাকায় পুলিশ বাহিনী রাজনৈতিক চাপ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণের আস্থা ক্রমাগত কমেছে, যার ফলে নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিরপেক্ষতা নিয়ে ভোটারদের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
এই লটারি পদ্ধতি চমকপ্রদ হলেও, এতে কিছু জটিলতা রয়েছে। দৈবচয়নের ভিত্তিতে পোস্টিং দেওয়ার ফলে অনভিজ্ঞ কর্মকর্তারা ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় দায়িত্ব পেতে পারেন অথবা স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল নন এমন কর্মকর্তাকে এমন এলাকায় পাঠানো হতে পারে, যেখানকার জটিল প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তার জানা নেই। এতে পুলিশের দৈনন্দিন সাধারণ কাজ এবং নির্বাচনের দিনের নিরাপত্তা দুটোই ব্যাহত হতে পারে। এ ছাড়া, এই ব্যাপক রদবদলে জেলা পুলিশের নেতৃত্ব, গোয়েন্দা ইউনিট এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিদ্যমান সমন্বয়ও ভেঙে যেতে পারে। নির্বাচন যখন প্রায় দোরগোড়ায়, তখন জেলার শীর্ষ পর্যায়ে দ্রুত এই পরিবর্তনের ফলে যে লজিস্টিক ও অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে, তা সময়মতো মোকাবিলা করা কঠিন হতে পারে।
সমালোচকরা সতর্ক করছেন, লটারির জন্য তৈরি করা তালিকাটিও নিরপেক্ষ হতে হবে। যদি অস্বচ্ছ মানদণ্ডের ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের তালিকা করা হয়, তাহলে পরবর্তীতে লটারি হলেও সেটি দীর্ঘদিন চলে আসা সমস্যা সমাধান করতে পারবে না।
এ ছাড়া, এই লটারি আসন্ন নির্বাচনের সময়কার অস্থির অবস্থাকেও প্রতিফলিত করে। লটারি হয়তো স্পর্শকাতর সময়ে পুলিশ ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য একটি জোরালো পদক্ষেপ। তবে এর প্রতীকী গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও, এটি একটি গভীরভাবে প্রোথিত দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার জন্য একটি স্বল্পমেয়াদি প্রতিকার হিসেবেই বিবেচনা হবে।
অনেক গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনের আগে পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি একটি সাধারণ প্রশাসনিক বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশে এটি এত বিতর্কিত হয়ে উঠেছে যে, এখন কেবল লটারি করে নাম নির্বাচন করলেই রাজনৈতিক পক্ষগুলোর ন্যায্যতা নিয়ে আশ্বস্ত হতে পারে। এই লটারি হয়তো তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কমাতে পারে। তবে এটি রাজনীতিকরণ, সংঘাতপূর্ণ রাজনীতি এবং স্বাধীন তদারকির অভাবের মতো কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করতে পারবে না। আমূল সংস্কার ছাড়া, আমাদের পুলিশ ব্যবস্থা সেই একই চাপের কাছে বারবার দুর্বল থাকবে, যে চাপের কারণে আজ এমন নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিতে হলো।


