সকালে রান্নাঘরে গ্যাসের চুলায় চা বসিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কক্সবাজারের ইনানীর টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টের এক কর্মী। কিছুক্ষণ পর বিকট বিস্ফোরণের শব্দ আর পরের মুহূর্তেই আগুনের লেলিহান শিখায় ঢেকে যায় তিনতলা রিসোর্টের গোটা ভবন। প্রাণ বাঁচাতে হুড়োহুড়ি করে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন কর্মী ও অতিথিরা। তবে আগুনের তীব্রতায় ভেতরে আটকে পড়েন অনেকে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার সকাল ৭টার দিকে রিসোর্টিতে আগুন লাগে। আগুন ভয়াবহ আকার ধারণের আগেই রিসোর্টটির মালিকের পোষা দুটি কুকুর ও চারটি বিড়াল নিয়ে বাইরে চলে আসেন কয়েকজন কর্মী। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আগুন নেভানোর পর ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেন। এ সময় দগ্ধ হন ছয়জন। তাদের মধ্যে চারজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
আগুনের ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন যশোরের একই পরিবারের চার পর্যটক। সুনির্দিষ্ট খোঁজ মেলেনি নাসরিন নামের এক নারী পর্যটকেরও।
রিসোর্টের কর্মীরা জানান, ভবনটির দ্বিতীয় তলায় মালিকের পোষা দুটি কুকুর ও চারটি বিড়াল রাখা ছিল। আগুন ছড়িয়ে পড়ার শুরুর দিকেই চার থেকে পাঁচজন কর্মী ওই প্রাণীগুলো নিয়ে বাইরে চলে আসেন।
রিসোর্টের কাছেই থাকা একটি বাড়ির বাসিন্দা বলেন, ‘বিস্ফোরণের শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে এসে দেখি, টুপটুপ জ্বলছে। প্রতিষ্ঠানের চার-পাঁচজন কর্মী কুকুর ও বিড়াল নিয়ে ছোটাছুটি করছেন। প্রাণীগুলো মালিক তানভীর পুষতেন বলে জানতাম। তাকে অসংখ্যবার কুকুর নিয়ে সৈকতে হাঁটতে দেখেছি।’
টুপটুপের কর্মীরা জানান, আগুনের সময় সেখানে ১৯ জন কর্মরত ছিলেন। ঘটনার পর তারা সবাই বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন বলে জানান রিসোর্টের ব্যবস্থাপক সুমন। তবে আগুন লাগার সময় অতিথিদের সবাই বের হতে পেরেছিলেন কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
গ্রেপ্তারের আগে সাংবাদিকদের সুমন বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের সময় আমিসহ রিসোর্টের ১৯ জন কর্মী সেখানে কর্মরত ছিলাম। আগুন লাগার পরপরই আমরা প্রাণ বাঁচাতে বেরিয়ে পড়ি।’
তার তথ্যানুযায়ী, রিসোর্টের নয়টি কক্ষের ছয়টিতে অবস্থান করছিলেন ২১ জন অতিথি। আগুনের পর তাদের মধ্যে কয়েকজনের নিখোঁজ থাকার খবর পাওয়া যায়। পরে ফায়ার সার্ভিস ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করে। যশোরের একই পরিবারের চার সদস্যের এখনো সন্ধান না মেলায় তাদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রায় কোটি টাকায় জমি কিনে রিসোর্ট, ছিল পোষা প্রাণীর সংগ্রহশালা
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের জুনে উখিয়ার ইনানী মৌজায় মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন প্রায় ১০ শতক জমি গিয়াস উদ্দিন গংয়ের কাছ থেকে প্রায় এক কোটি টাকায় কেনেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার বাসিন্দা টিপু সুলতান মিয়ার ছেলে তানভীর সুলতান মিয়া। পরে ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোরশেদকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে গড়ে তোলেন টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্ট। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু হয়।
রিসোর্টের পাশাপাশি তানভীরের সার্ফনেট নামে ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অতিথিদের আকৃষ্ট করতে রিসোর্টে পোষা কুকুর ও বিড়াল রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন তানভীর। সেখানে কেনি নামের ইতালীয় প্রজাতির একটি কুকুর, কিয়ানা নামের জার্মান প্রজাতির আরেকটি কুকুর এবং পার্সিয়ানসহ বিদেশি প্রজাতির কয়েকটি বিড়াল ছিল। প্রাণীগুলো পোষার পাশাপাশি কেনাবেচাও করা হতো।
অগ্নিকাণ্ডের পর মালিক তানভীরের অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তার ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোরশেদেরও খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে তারা কোথায় রয়েছেন, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে মঙ্গলবারের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান।


