দেশে দীর্ঘদিনের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন ও সীমান্ত হত্যার মতো ঘটনাগুলোর কার্যকর তদন্তের মাধ্যমে দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ইসফানদিয়ার জাহান হাসান চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত এইচআরএসএস-এর ১২তম জাতীয় মানবাধিকার সম্মেলন–২০২৬ থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী ও বিচারবিদরা এই আহ্বান জানান।
‘যুব সমাজকে ক্ষমতায়ন ও অধিকার সুরক্ষা’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই দিনব্যাপী সম্মেলনে সংগঠনের ২০২৫ সালের কার্যক্রম পর্যালোচনা, ‘বাংলাদেশের বার্ষিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৫’ এবং ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট–২০২৬’ বিষয়ক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলামের স্বাগত বক্তব্যের পর বিশেষ অধিবেশনে ‘রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন: ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিতার প্রশ্ন’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী সারা হোসেন, মো. নূর খান, সানজিদা ইসলাম এবং আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের অংশগ্রহণে এই অধিবেশনে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও নিখোঁজদের স্বজনরা তাদের ভয়াবহ ও বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সত্য উদ্ঘাটন, স্বাধীন তদন্ত, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানান। বক্তারা স্পষ্ট করে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই মানবাধিকার সুরক্ষা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
অপরদিকে, ‘সীমান্তে নিরাপত্তা ও মানবাধিকার’ শীর্ষক আলোচনায় মানবাধিকার কর্মী সাজ্জাদ হোসেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ বক্তব্য দেন।

এ সময় সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে নিহত ফেলানী খাতুনের বাবা নুর ইসলাম ও নিহত মুরসালিনের ভাই ইয়াসিন মিয়া তাদের স্বজন হারানোর আর্তনাদ ও নির্মম অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। বক্তারা অবিলম্বে সীমান্ত হত্যা বন্ধে কার্যকর দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং একটি মানবাধিকারভিত্তিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দেন।
সম্মেলনের অতিথি বক্তৃতা পর্বে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের বাংলাদেশ অফিসের কর্মকর্তা মো. জাহিদ হোসেন এবং এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর পরিচালক ব্যারিস্টার মো. খলিলুর রহমান খান অতীতের সকল মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। একই সাথে তারা ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনে একটি কার্যকর জাতীয় কাঠামো গড়ে তোলার তাগিদ দেন।
তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি মানবিক, বৈষম্যহীন ও নির্যাতনমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে দ্বিতীয় জাতীয় মানবাধিকার অলিম্পিয়াড-২০২৬-এর বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পরিশেষে এইচআরএসএস-এর চেয়ারম্যান শাহজাদা আল আমিন কবিরের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে এই জাতীয় মানবাধিকার সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটে।


