আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তার বাবা-মা, সহপাঠী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। আইনজীবী ও রাষ্ট্রপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আপিল করার কথাও জানিয়েছেন তারা।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রায়ের অপেক্ষায় ছিলেন জুলাই আন্দোলনে প্রথম নিহত আবু সাঈদের বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যরা। দুপুরে রায় ঘোষণার পর অসন্তুষ্ট মনে সাঈদের কবরের পাশে যান মা মনোয়ারা বেগম ও বাবা মকবুল হোসেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন মামলার সাক্ষী ও চাচাতো ভাই রুহুল আমিন। কিছুক্ষণ কবরের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকার পর তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
রায় ঘোষণার পর তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন মনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার ছইলের জীবন দিয়া তো কিছুই হইল না। এই বিচারে শান্তি হয় নাই। মোরও শান্তি হইল না। হামার ছইলের আত্মাও শান্তি পাবার নয়। দুনিয়াত সঠিক বিচার নাই।’
রায়ে দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বাকি ২৮ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আবু সাঈদের মা আরও বলেন, ‘বিচার ঠিক হয় নাই। আশা করছি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বিচার সঠিক করবে। দুই আসামির ফাঁসির রায় দিছে। আর গুলাক ফাঁসির রায় দেয় নাই।’
‘অনেকগুলো আসামিক ধরে নাই। হত্যার সঙ্গে জড়িত আছলো সেগুলো পালাই গেছে। এখন সরকার হিসেবে তারেক রহমানের কাছে সঠিক বিচারটা চাওছি। আরও বড় বড় নেতা, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, পুলিশের বড় বড় অফিসার, শেখ হাসিনা ভারতে পালায় আছি এবং আরও যারা আমার ছইল হত্যা করবার হুকুম দেছে তাকেও ধরবার কওছি। হুকুমদাতার ঘরক ধরা হয় নাই। অনেকে বাইরে আছে ফির শাস্তি কম দেছে, ৫ বছর ১০ বছর এতে হামরা খুশি নাই। হামাক যেন আপিল করবে দেন।’
বাবা মকবুল হোসেনও রায়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘যে দুইজনকে ফাঁসি দিয়েছে, তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। এতে আমি সন্তুষ্ট নই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আরও লোকের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল। তবে এক নম্বরে হলো পোমেল বড়ুয়া সাংঘাতিক দোষী। ছেলেকে বিনা দোষে অপদস্ত করেছে। গলা টিপে ধরেছিল। ছাত্রলীগের লিডার আমার ছেলের গাল বুকে থাপড়াইছে। আমার ছেলে রোকেয়া ভার্সিটির সমন্বয়ক হিসেবে বক্তব্য দিয়েছিল। বলেছিল আমি কোনো সরকারবিরোধী আন্দোলনে বক্তব্য দিচ্ছি না। আমি অধিকার আদায়ের জন্য বক্তব্য দিচ্ছি। যার কারণে এসে গলা টিপে ধরেছিল এই পোমেল বড়ুয়া। তার ফাঁসির রায় হলো না। আর মাত্র দুই জনের ফাঁসি, এটায় সন্তুষ্ট নই আমরা। আরো বেশি লোকের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল। এই রায়ে আমি সন্তুষ্ট হতে পারলাম না।’
‘যারা অপরাধী তারাই পালায় গেছে। এই যে পালাল আসাদ মন্ডল। যদিও নাম বলা ঠিক না। আমার ছেলেক মারার জন্য উনি জড়িত ছিল। সেই জন্য বললাম। এ রকম যারা অপরাধী তারা অনেকে এড়িয়ে গেছে। পুলিশের বড় কর্মকর্তা তাদের কোনো সাজা দেওয়া হয়নি। যাদের আদেশে আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে তারাই বাঁচি গেল। বড় বড় অপরাধীরা বাঁচি গেছে।’
হত্যা মামলার সাক্ষী ও চাচাতো ভাই রুহুল আমিন বলেন, ‘উচ্চ পদস্ত কর্মকর্তা রয়েছেন, তারাই গুলি করা এবং লাঠিচার্জ করার আদেশটা করেন। সে ক্ষেত্রে যারা ইন্ধনদাতা, যারা আদেশদাতা তাদেরকে ফাঁসি না দিয়ে দুইজন কনস্টেবলের ওপর দিয়ে এই রায় ঘোষণা করল। এটা আমরা কোনোভাবে মেনে নিতে পারছি না। অবশ্যই পরিবার, আইনজীবী এবং রাষ্ট্রের সাহায্য নিয়ে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যাদের যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে তাদেরকে ফাঁসি দেওয়া উচিত ছিল। যারা ইন্ধনদাতা ছিল এই হত্যাকাণ্ডের সাথে তাদের এত কম শাস্তি দিয়ে রায় দিয়েছে এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা আশা করছি, এই রায়ের যদি আপিল করে সাজা বাড়ানো যায় তাহলে অন্তত পরিবার থেকে সবাই খুশি থাকবে। অনেক আসামি আবার পলাতক রয়েছে তাদের ধরার কোনো পদক্ষেপ নাই।’
রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সাঈদের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেওয়া সমন্বয়করাও।
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ও সমন্বয়ক শামসুর রহমান সুমন বলেন, ‘আমরা হতাশ হয়েছি। দীর্ঘ দুই বছর পর এই রায় দেওয়া হলো। চেয়েছিলাম অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই রায় দেওয়া হোক, কিন্তু সেটা দেওয়া হয়নি। বরং যে রায় দেওয়া হয়েছে তাতে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। মনে হচ্ছে যেন অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। এই রায় আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। অবিলম্বে রায় রিভিউয়ের বন্দোবস্ত করবার জন্য রাষ্ট্রপক্ষকে আহ্বান জানাচ্ছি।’
জাতীয় যুব শক্তির কেন্দ্রীয় সংগঠক মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘এই রায়ের মাধ্যমে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়নি। এই রায়ের দিকে তাকিয়ে ছিল দেশ-বিদেশের মানুষ। কিন্তু খুব হালকাভাবে দেওয়া হলো এই রায়। এর মাধ্যমে পরবর্তী মামলাগুলোর ওপর এই রায়ের প্রভাব পড়বে। আমরা আশা করি সরকারপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন। খুবই দ্রুত রায় রিভিউ করার আবেদন করবেন।’
তবে রায় নিয়ে অসন্তুষ্ট হলেও রায় হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম শওকত আলী। তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্ব দেখেছে কীভাবে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড জুলাইয়ের একটি অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। কিন্তু যে রায় দেওয়া হয়েছে, তাতে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হয়েছে । তবে দীর্ঘদিন পরে হলেও যে রায়টি দেওয়া হয়েছে তাতে আমি সন্তুষ্ট। কারণ, এই রায় দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমি বিভিন্নভাবে কথা বলেছি। পরিবার এবং রাষ্ট্রপক্ষ সমন্বয়করা মিলে রায়ের ব্যাপারে আপিল করা হবে কিনা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’


