অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিতে সচিব পদমর্যাদায় বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে জনপ্রশাসনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। জ্যেষ্ঠ আমলাদের আশঙ্কা, এ ধরনের পদক্ষেপ প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বিনষ্ট করছে এবং নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ রুদ্ধ করছে।
বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের চার মাসের মধ্যে অন্তত চারজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সচিব পদমর্যাদায় সরকারি সংস্থার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে এসব পদে যুগ্ম সচিব বা অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মরত কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হতো।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে প্রায়ই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ দপ্তরের প্রধানদের যদি সচিবের পদমর্যাদা দেওয়া হয়, তবে তা জবাবদিহিতা ও কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার ওপর মারাত্মক প্রশ্ন তোলে।’
তিনি আরও বলেন, নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা নিয়মিত সচিবদের চেয়ে বয়সে জ্যেষ্ঠ এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের জোরে তারা এসব পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।
এই কর্মকর্তার মন্তব্য, ‘তারা কি মন্ত্রণালয়ের সচিবদের নির্দেশ মেনে চলবেন? বরং তারা নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করার সম্ভাবনাই বেশি।’
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত জনপ্রশাসনে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সখ্য গড়ে তুলতে উৎসাহিত করতে পারে, যাতে অবসরের পর আকর্ষণীয় পদ বাগানো যায়। এছাড়া এই নীতি সরকারের খরচও বাড়িয়ে দেয়। কারণ যুগ্ম সচিব বা অতিরিক্ত সচিবদের চেয়ে সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পেছনে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় হয়।
তবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী এই নীতির পক্ষে সাফাই গেয়ে যুক্তি দেন, মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগাতে প্রতিটি সরকারই দীর্ঘদিন ধরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ওপর নির্ভর করে আসছে।
তিনি টাইমস’কে বলেন, ‘এসব নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার সরকারের রয়েছে। যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদেরই নির্বাচন করা হচ্ছে, যা আগের প্রতিটি সরকারের আমলেও দেখা গেছে।’
সাম্প্রতিক নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন সফিজ উদ্দিন আহমেদ, যাকে গত ১৮ এপ্রিল ওয়াকফ প্রশাসন কার্যালয়ের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া গত ৩০ এপ্রিল কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয় এ কে এম ফজলুজ্জোহাকে।
মে মাসে আবদুস সবুরকে এক বছরের চুক্তিতে সচিব পদমর্যাদায় বস্ত্র অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সবুর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুগ্ম সচিব হিসেবে অবসরে যান। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তাকে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের পরিচালক করা হয়।
সবুর এবং ফজলুজ্জোহা উভয়েরই বিএনপির সাথে যোগাযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালে তারা দুজনই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবি জানিয়ে অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘পলিসি ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসার্চ সোসাইটি’র দেওয়া বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন।
এই সোসাইটির সভাপতি মোহাম্মদ ইসমাইল জবিউল্লাহ বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর এর সাধারণ সম্পাদক আবদুল বারী হলেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী।
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও একই ধরনের বিতর্ক সামনে এসেছিল। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)-এর মতো সংস্থাগুলোর প্রধান হিসেবে অতিরিক্ত সচিবদের দায়িত্ব দেওয়া হতো।
অথচ, ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিপিপিএ’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মঈন উদ্দিন আহমেদকে সচিবের পদমর্যাদা দেওয়া হয়। একইভাবে, ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ডিটিসিএ’র নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মশিউর রহমানসহ ১১৯ জন কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষভাবে সচিব পদমর্যাদায় পদোন্নতি দেওয়া হয়।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের এই প্রবণতার সমালোচনা করেছেন শিক্ষাবিদ ও প্রাক্তন আমলারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান বলেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিসাধন করে।
সাদিক হাসান বলেন, ‘রাজনৈতিক নিয়োগ একটি ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। যখন কোনো বাইরের ব্যক্তিকে শীর্ষ পদে বসানো হয়, তখন তা নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ বন্ধ করে দেয় এবং পুরো সার্ভিস জুড়েই মনোবল ভেঙে দেয়।’
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, সরকারগুলো রাতারাতি রাজনৈতিক সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসতে হিমশিম খাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘অনেক যোগ্য কর্মকর্তা উপেক্ষিত হয়ে অপেক্ষা করে থাকেন, অথচ সরকার বিশেষ কিছু ব্যক্তিকে সুযোগ-সুবিধা বিলিয়ে দেয়। জনপ্রশাসনে এ ধরনের প্রথার কোনো স্থান থাকা উচিত নয়।’


