হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নিজেদের অরাজনৈতিক ইসলামী সংগঠন বলেই দাবি করে। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আগে এসে দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা হাত মেলাতে শুরু করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে। আর এতে দলের মধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে বিভাজন, যা সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে হেফাজতকে।
হেফাজত সবসময়ই নিজেদের ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক সংস্কারে নিবেদিত একটি সংগঠন হিসেবে তুলে ধরে এসেছে। তবে এখন সংগঠনটি গভীরভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। সংগঠনের নেতাকর্মীরা বলছেন, অনেক জ্যেষ্ঠ আলেম প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়াতে এবং নির্বাচনী সুবিধা আদায়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছেন। যদিও শীর্ষ নেতারা যেকোনো সংকটের কথা অস্বীকার করছেন এবং নিজেদের ঐক্য প্রদর্শনে নানা ধরনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
ব্যালট বাক্সে হেফাজত ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সরাসরি প্রভাব কম। কিন্তু গত বছর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত হয়ে যাওয়ায় নতুন সুযোগের আভাস পাচ্ছে সংগঠনটি। বিশেষ করে মূলধারার দলগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায়, ভোট নিশ্চিত করতে আগ্রহী বড় জোটগুলো ছোট ছোট ইসলামী দলগুলোকে কাছে টানছে। আর সে সুযোগটিই কাজে লাগাতে চায় হেফাজত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারায় আলেমদের সম্পৃক্ততার পক্ষেই কথা বললেন হেফাজতের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব জুনাইদ আল হাবিব।
তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক সদস্য বিভিন্ন ইসলামী দলেরও সদস্য। তাই আগামী নির্বাচনে এসব দল বিভিন্ন জোটে যোগ দিলেও হেফাজতের মধ্যে কোনো সংকট তৈরি হবে না।’
কিন্তু বাস্তবে বিভেদের চিহ্ন সবখানেই স্পষ্ট।
সম্প্রতি হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী জামায়াতে ইসলামীকে ‘প্রতারক ইসলামী দল’ হিসেবে আখ্যায়িত করায় কওমি আলেমদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিভাজন নতুন করে চাঙ্গা হয়েছে। চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই সদস্যের তার সঙ্গে সাক্ষাতের পরপরই তিনি এই মন্তব্য করেন। যা এর পেছনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে জল্পনা উসকে দিয়েছে।
অবশ্য পরে হেফাজত দাবি করেছে যে, এই মন্তব্য বাবুনগরীর ‘ব্যক্তিগত মতামত’।
হেফাজতের সঙ্গে যুক্ত বেশিরভাগ নেতাই কওমি এবং ভারতীয় দেওবন্দি মাদ্রাসা ঘরানার। সংগঠনটির ছাতার নিচে রয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি এবং খেলাফত আন্দোলনের মতো দলগুলো। এই দলগুলোর সিনিয়র আলেমরা হেফাজতের সাংগঠনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন। যা হেফাজতের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যবর্তী রেখাকে আরও অস্পষ্ট করে তোলে।
যদিও হেফাজত এবং চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতাদর্শগত মিল রয়েছে, তবুও চরমোনাই পীরের দলের কোনো নেতা হেফাজতের কোনো আনুষ্ঠানিক পদে নেই।
দেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ‘মওদুদী-অনুপ্রাণিত’ মতাদর্শের। আর এ কারণে হেফাজতের কওমি ঘরানার সঙ্গে তাদের মতবাদগত পার্থক্য দীর্ঘদিনের। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে সৃষ্ট নতুন নতুন নানা পরিবর্তনের মতো অনেক কওমি নেতাও জামায়াতের কাছাকাছি এসেছেন। অনেকেই এই সহযোগিতাকে কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক বলেও মনে করছেন।
এসব দলের মধ্যে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস এবং নেজামে ইসলাম পার্টি।
এই দলগুলো জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে এবং গণভোটের মাধ্যমে পাঁচটি দাবি আদায়ে জামায়াতের সঙ্গে যৌথভাবে প্রচার চালাচ্ছে। অবশ্য তারপরেও বেশ কয়েকজন নেতা কোনো একক জোটের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার আগে রাজনৈতিক ঝুঁকি ও জোটে গেলে কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে তা বিবেচনা করে দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছেন।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং ইসলামী ঐক্যজোটের বিভিন্ন অংশ বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কয়েকটি খবরে বলা হয়েছে, বিএনপি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি ওবায়দুল্লাহ ফারুককে সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) এবং জুনাইদ আল হাবিবকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ‘সবুজ সংকেত’ দিয়েছে।
এর আগে ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ফারুক বিএনপি জোটের ব্যানারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
বর্তমানে রাজপথের আন্দোলনে জামায়াতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললেও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির এবং হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে যে বিএনপি তার জন্য ঢাকা-৭ আসনটি ছেড়ে দেবে।
মামুনুল বলেন, ‘আমরা কয়েকটি ইসলামী দলের যৌক্তিক আন্দোলনের অংশ, কিন্তু আমাদের চূড়ান্ত নির্বাচনী জোট এখনো ঠিক হয়নি।’
এদিকে, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব এবং হেফাজতের নায়েবে আমির আহমদ আব্দুল কাদির জামায়াতের পক্ষ নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী এবং নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইজহার; দুজনেই হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব। এরা জামায়াতের জোটে যোগ দিতে পারেন বলে তাদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট হচ্ছে।
হেফাজতের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো স্বীকার করেছে যে নির্বাচনী জোট নিয়ে মতবিরোধ চরমে পৌঁছেছে। জ্যেষ্ঠ আলেমরা প্রায়ই নিজেদের বক্তব্য বা খুতবায় একে অন্যের সমালোচনা করছেন। এমনকি ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে হেফাজতের মতাদর্শগত ভিত্তি থাকলেও তারা জামায়াতের সহযোগিতা চাওয়ায় আক্রমণের শিকার হয়েছে।
ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘২০১৩ সালে হেফাজত নেতারা জামায়াতের সঙ্গে একই মঞ্চে ছিলেন। কিন্তু এখন তারা দলটির বিরোধিতা করছেন। এই দ্বিমুখী নীতি কেন? তারা জনগণকে জামায়াতে ভোট দিতে নিষেধ করেন কিন্তু বিএনপির চাঁদাবাজদের সঙ্গে জোট করতে তাদের কোনো সমস্যা নেই! এটা কেমন অবস্থান? এমনকি তারা সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ‘কওমি জননী’ বলেও ডেকেছিলেন। এর ন্যায্যতা এখন কীভাবে দেবেন তারা?’
যশোর ও সাতক্ষীরার জেলা পর্যায়ের হেফাজত নেতারা বলছেন, বাবুনগরীর মন্তব্য এবং জোট ঘিরে বিতর্ক সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যক্তিগত বিভেদ তৈরি করেছে। তারা মনে করেন, প্রতিদ্বন্দ্বী জোটে যুক্ত হওয়ার কারণে সাবেক মিত্ররাও প্রতিপক্ষে পরিণত হয়েছেন।
সংগঠনের মধ্যে যখন এত কিছু চলছে তখন সবকিছু স্বাভাবিক দেখাতে হেফাজতের সিনিয়র নেতারা গত সোমবার একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। যেখানে তারা পুনর্ব্যক্ত করেন যে, হেফাজতে ইসলাম ঐক্যবদ্ধ রয়েছে এবং এটি একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। নির্বাচনের আগে কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে বিবৃতি দেওয়া থেকে সদস্যদের বিরত থাকতে নির্দেশও জারি করা হয়। হেফাজতের তত্ত্বাবধানে থাকা মাদ্রাসা প্রশাসকদেরও নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অনুদান গ্রহণ এড়ানোর বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
হেফাজত ও জমিয়তের যুগ্ম মহাসচিব মনির হোসেন কাসেমী বিভেদের কথা উড়িয়ে দেন। তার মতে, এসব নিছকই গুজব।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী জোট নিয়ে কোনো সংকট নেই, এগুলো শুধুই গুজব।’
হেফাজত জানিয়েছে যে আনুষ্ঠানিকভাবে তারা কোনো নির্বাচনী জোটে যুক্ত হবে না। কিন্তু তাদের যে নেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত সেটিকে হেফাজত দেখছে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক কার্যকলাপ হিসেবে।
সমালোচকরা বলছেন, হেফাজতের নেতৃত্বে পক্ষপাতিত্ব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। নিরপেক্ষ সংগঠন হিসেবে দাবি করার পরও মতাদর্শবিরোধী দলগুলোর জন্য ‘রাজনৈতিক দালালি’ করছেন হেফাজতের নেতারা। আর এটিকে ভণ্ডামি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
অবশ্য হেফাজতের জন্য এই স্ববিরোধিতা নতুন নয়।
২০১৮ সালে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক সমাবেশে হেফাজত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধিতে ভূষিত করে। সেসময় এটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়।
দলের অনেকেও ছিলেন ক্ষুব্ধ। কারণ তাদের দাবি, ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে হেফাজতের সমাবেশে হামলা চালিয়ে সংগঠনের বহু সদস্যকে হত্যা করা হয়েছিল। অনেকেই আহত হয়েছিলেন। তাই সেই সরকারের প্রধানকে এমন উপাধি দেওয়ার বিষয়টি মানতে পারেননি হেফাজতের অনেক নেতাকর্মী।
বারবার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার এবং বারবারই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সখ্যতা স্থাপনের এই চক্র হেফাজতের অরাজনৈতিক থাকার দাবিকে তাই ক্রমশই দুর্বল করে দিচ্ছে।


