রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়, ব্যক্তিগত আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের রাউজানে গড়ে উঠেছে এক ভয়ঙ্কর ‘অস্ত্রের সাম্রাজ্য’।
গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নয়াপাড়া, পূর্ব গুঁজরা এবং কদলপুরসহ এই অঞ্চলের সক্রিয় তিনটি বড় অপরাধী চক্রের হাতে অন্তত ২১০টি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। এই অস্ত্রের ভাণ্ডারে একে-৪৭, একে-২২ এবং চীনা রাইফেলের মতো অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব গ্যাং বা চক্রের সাবেক সদস্যদের বরাতে আরও জানা যায়, তাদের কাছে ৯ এমএম পিস্তল, এলজি, শটগান, পাইপগান, দোনলা বন্দুকসহ অসংখ্য দেশীয় তৈরি অস্ত্র রয়েছে।
অপরাধী গ্যাং ও তাদের নেতা
গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও দল থেকে বেরিয়ে যাওয়া সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ অস্ত্রের সবচেয়ে বড় অংশ রয়েছে ফজলুল হক গ্রুপের কাছে। তাদের কাছে আনুমানিক ১৫০টি অস্ত্র রয়েছে। ফজলুল বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম আকবর খন্দকারের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি দেশের বাইরে ছিলেন এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে ফিরে আসেন। বর্তমানে নয়াপাড়া এলাকায় তার গ্রুপটি বেশ সক্রিয় এবং তার বিরুদ্ধে হত্যা ও অপহরণসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
অন্যদিকে, কদলপুর এলাকার মোহাম্মদ রায়হান গ্রুপের কাছে প্রায় ৪০টি অস্ত্র রয়েছে বলে জানা গেছে। রায়হান একসময় ইসলামী ছাত্রশিবিরের কুখ্যাত ক্যাডার সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারী ছিলেন, তবে এখন তিনি নিজের বাহিনী পরিচালনা করেন। তার বিরুদ্ধে ৮ থেকে ১৫টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। রাঙ্গুনিয়া ও রাউজানের সীমান্তবর্তী পাহাড়তলী এলাকায় যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের পর সিসিটিভি ফুটেজে রায়হানের সহযোগীদের চিহ্নিত করা হয়।
হাজী জসিমের নেতৃত্বাধীন তৃতীয় একটি গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ২০টিরও বেশি অস্ত্র। রাউজান এমপি গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত জসিমের বিরুদ্ধে নয়াপাড়া এলাকায় অস্ত্র প্রদর্শন ও সহিংস সংঘর্ষের মাধ্যমে দাপট বজায় রাখার অভিযোগ রয়েছে।
বাড়ছে সহিংসতা ও হতাহতের সংখ্যা
এসব অস্ত্রের অবাধ ব্যবহারের কারণে এলাকায় ব্যাপক রক্তপাতের ঘটনা ঘটছে। গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১৪ জুন পর্যন্ত রাউজানে বিভিন্ন সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ। এসব হতাহতের বেশিরভাগই ঘটেছে রাজনৈতিক মহড়া এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের লড়াইকে কেন্দ্র করে, যেখানে এসব অবৈধ অস্ত্র দেদারসে ব্যবহার করা হয়েছে।
এলাকার এই আইনশৃঙ্খলার অবনতি উচ্চ মহলেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গত ৩১ মে জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এই অঞ্চলের নিরাপত্তা উদ্বেগ নিয়ে কথা বলেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী—সব জায়গাতেই নজর দেওয়া হবে। সেজন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। রাউজান কি রাষ্ট্রের বাইরে?’
চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, এই অঞ্চলের ভৌগোলিক গঠন অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। তিনি বলেন, ‘এখানে অনেক “গল্প” বা জটিলতা এবং নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতাগুলোই আমাদের অভিযানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত শনিবার দুর্গম পাহাড়ে অভিযান চালানোর পরও স্থানীয়দের সহযোগিতা ছাড়া শতভাগ সফল হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘এখানকার পাহাড়গুলো এতটাই দুর্গম এবং বিশাল যে, দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের সাহায্য ছাড়া সফল অভিযান চালানো প্রায় অসম্ভব।’ ভবিষ্যৎ অভিযানের জন্য সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহের ওপরও জোর দেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা সত্ত্বেও, ভয়ের তীব্রতায় স্থানীয়দের মাঝে এক ধরনের নীরবতা কাজ করছে। পাহাড়তলী বাজারের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রাউজানে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করা হয়। দিনদুপুরে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা মানুষকে অনায়াসে খুন করে চলে যায়।’
এই অপরাধী চক্রগুলোর সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধি এবং চিহ্নিত মাদক চোরাকারবারিদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যুবদল নেতা মোহাম্মদ হেলাল বর্তমানে হেফাজতে থাকলেও, অনেক অস্ত্রধারী এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে এবং অনেকে নিজ এলাকাতেই বহাল তবিয়তে আছেন।


