তালেবান শাসনে বাড়ছে নারী হত্যা

তালেবান শাসনে বাড়ছে নারী হত্যা
ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে রেকর্ড করা এক ভয়েস মেসেজে ৩৩ বছর বয়সী লিজা শামস এক স্বজনকে তার জন্য দোয়া করতে বলেন। তিনি বলেন, ‘আমার দুর্ভাগ্যের দিনগুলোর কোনো শেষ নেই। হাসিব (স্বামী হাসিবুল্লাহ সারওয়ারি) আমার সঙ্গে যা করেছে, তার জন্য সে যেন সারা বিশ্বের সামনে লজ্জিত হয়, সেই দোয়া করো।’

দ্বিতীয় একটি রেকর্ডিংয়ে তিনি জানান, গর্ভবতী অবস্থায় সারওয়ারি তাকে মারধর করেন। পরে কয়েক দিন তাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। আঘাতের কারণে তিনি খেতে বা কথা বলতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘আমি একজন নারী। ঘরের ভেতরে কী ঘটে, তা নিয়ে আমার কথা বলা উচিত নয়। তবে আমি আর সহ্য করতে পারছি না।

১ ফেব্রুয়ারি বিকালে লিজার প্রতিবেশীরা চিৎকার শুনে পুলিশকে খবর দেন। এর কিছুক্ষণ আগে লিজার বাবা শামসুদ্দিন শামস মেয়ের কাছ থেকে একটি ভিডিও কল পান। তার জখম ছিল ভয়াবহ।

শামসুদ্দিন বলেন, ‘তার চোয়াল ভেঙে গিয়েছিল। প্রায় কথাই বলতে পারছিল না।’ তবু তিনি জানাতে পেরেছিলেন, স্বামী আবারও তাকে মারধর করেছেন। শামসুদ্দিন দ্রুত কাছাকাছি থাকা তার অন্য দুই মেয়েকে খবর দেন। তারা এসে লিজাকে কাবুলের রহমত হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে পৌঁছানোর প্রায় এক ঘণ্টা পর তার মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর প্রতিবেদনে দেখা যায়, লিজার মুখমণ্ডলে ভয়াবহ আঘাত করা হয়েছিল। সিটি স্ক্যানে গালের হাড় ও সাইনাসের দেয়ালে একাধিক ভাঙনের চিহ্ন পাওয়া যায়। চিকিৎসকদের মতে, মুখে প্রচণ্ড ভোঁতা আঘাতের সঙ্গেই এই জখমের মিল রয়েছে। মৃত্যুর দিন সন্ধ্যায় করা শারীরিক পরীক্ষা ও মরদেহের ছবিতে মুখ ও সারা শরীরে ব্যাপক আঘাত, ক্ষত ও ফোলার চিহ্ন দেখা যায়।
এত গুরুতর জখম থাকা সত্ত্বেও ফরেনসিক প্রতিবেদনে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ইঁদুর মারা বিষ খাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিবারের অনুরোধে ময়নাতদন্ত করা হয়নি। লিজার বাবা জানান, এই অনুরোধ করেছিলেন তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন।

স্বামীর পরিবার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে তাদের দাবি, লিজা আত্মহত্যা করেছেন। শরীরের ক্ষতের দাগ বিষের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। আফগানিস্তানে সহিংস পরিস্থিতিতে নারীর মৃত্যুর অনেক ঘটনাই আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত হয়। এতে সাধারণত কারও জবাবদিহি হয় না। লিজার বাবার বিশ্বাস, এটি হত্যাকাণ্ড।

একটি স্পষ্ট চিত্র
প্রতি বছর কতজন আফগান নারী নিহত হন, তালেবান সরকার তার কোনো তথ্য সংগ্রহ করে না। আগে এই তথ্য সংগ্রহ করত অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়। ২০২৩ সালে সেটি বিলুপ্ত করা হয়।

রাষ্ট্র যেখানে তথ্য রাখছে না, সেখানে অনুসন্ধান চালিয়েছে জ্যান টাইমস। আফগানিস্তানে গোপনে কাজ করা এই সাংবাদিক নেটওয়ার্ক ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর দেশটির ৩৪টি প্রদেশের ১০টিতে নারী হত্যার তথ্য সংগ্রহ করে। স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ১৭৪টি ঘটনা ও সাংবাদিকদের সরাসরি নথিভুক্ত করা আরও ৫৭টি অপ্রকাশিত ঘটনা এতে যুক্ত করা হয়। তদন্তে দেখা যায়, স্বামী, বাবা ও ভাইয়ের হাতে ঘরের ভেতর নারীরা খুন হচ্ছেন। বিচারহীনতার এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক হত্যার কোনো সরকারি নথিও নেই।

দলটি মোট ২৩১টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে ৫৩টিকে আত্মহত্যা বলা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঘটনা জাওজজান (৩৬), হেরাত (৩২), বাদাখশন (২৮) ও গজনীতে (২৬)। নিহতদের বয়স পাঁচ থেকে ৬৫ বছর। ২৩১ জনের মধ্যে ১৬৫ জনই গৃহিণী। পারিবারিক সহিংসতার মামলা করার মতো স্বাধীন আয় বা প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান তাদের ছিল না। বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ভুক্তভোগীর নিজ বাড়িতে। পুরো ডেটাসেটে মাত্র ৫৮টি গ্রেপ্তারের তথ্য রয়েছে। হত্যার শক্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পাঁচটির বেশি ঘটনার একটিকে আত্মহত্যা বলা হয়েছে। ২৩১টি হত্যার মধ্যে মাত্র প্রতি চারটিতে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহভাজনকে অল্প সময়ের মধ্যেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কখনো আটকের এক দিন পরই মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

সাংবাদিকরা এমন অনেক ঘটনার তথ্য পেয়েছেন, যেখানে পরিবার বা প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে মৃত্যু হয়েছে পারিবারিক সহিংসতায়। অথচ সরকারি নথিতে সেগুলো আত্মহত্যা হিসেবে লেখা হয়েছে।

জাওজজানের এক স্বাস্থ্যকর্মী জানান, হাসপাতালে আনা অনেক নারীর শরীরে মারধর ও গুরুতর আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল। তবু সেগুলো আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
কাবুলে জাতিসংঘের একটি সংস্থার ৩৩ বছর বয়সী কর্মী ফ্রেস্তা এমাদিকে ৩১ মে তার বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার স্বামী তালেবান পুলিশকে জানান, মানসিক সমস্যার কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

তবে পরিবার ও বন্ধুরা বিশ্বাস করেন, ফ্রেস্তাকে তার স্বামী হত্যা করেছেন। তাকে চেনেন এমন পাঁচজন জানান, ১৭ বছর বয়সে বিয়ের পর টানা ১৫ বছর তিনি মারধর, গলা চেপে ধরা ও নিয়ন্ত্রণের শিকার হন। এক সহকর্মীর কাছে ফ্রেস্তা বলেছিলেন, তার স্বামী বারবার গলা চেপে ধরে বলতেন, ‘আমি তোমার গলা কেটে ফেলব।’

পরিবারের সদস্যদের জন্যও বিপদ
মেয়েদের পক্ষে দাঁড়াতে গেলে অনেক পরিবারও প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়। কান্দাহারে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে তার চেয়ে অনেক বেশি বয়সী এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। নির্যাতনের কারণে সে বাবার বাড়িতে ফিরে যায়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে স্বামী তাকে জোর করে ফিরিয়ে নিতে এলে সে অস্বীকৃতি জানায়। তখন স্বামী পিস্তল বের করে তাকে গুলি করে হত্যা করেন। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে যাওয়া ছোট ভাইও গুলিবিদ্ধ হন। এক সপ্তাহ পর তার মৃত্যু হয়।

তালেবান মামলা নিলেও অভিযুক্ত স্বামী, যিনি নিজেও তালেবান সদস্য, কখনো গ্রেপ্তার হননি।

মে মাসে সার-ই-পুল প্রদেশে ১৬ বছর বয়সী সারা ও তার মা চামানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ইরানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক চামানের মেয়ের সঙ্গে স্থানীয় এক তালেবান কর্মকর্তা জোর করে বাগদান চাপিয়ে দেন। নির্ধারিত পণ না পেয়ে চামান মেয়েকে দিতে অস্বীকৃতি জানালে ওই কর্মকর্তা তাকে রাইফেলের বাট দিয়ে মারধর করেন। সারা মায়ের দিকে ছুটে গেলে দুজনকেই গুলি করেন। পরে চিরুনি অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি এখনও কারাগারে আছেন।

তালেবানের নতুন ফৌজদারি বিধিতে স্ত্রীকে মারধর করে দৃশ্যমান আঘাত, হাড় ভাঙা বা ক্ষত সৃষ্টি করলে স্বামীর সর্বোচ্চ শাস্তি ১৫ দিনের কারাদণ্ড। অন্যদিকে স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাবার বাড়িতে গেলে এবং পরিবার তাকে ফিরিয়ে না দিলে স্ত্রী ও তার পরিবারকে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। ফলে পারিবারিক সহিংসতা থেকে আশ্রয় নেওয়ার শাস্তি সহিংসতার শাস্তির চেয়েও কঠোর।

তালেবান ক্ষমতায় আসার আগেও আফগান নারীরা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হতেন বৈশ্বিক গড়ের প্রায় তিন গুণ বেশি। ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত ইউএন উইমেনের ২০২৪ সালের আফগানিস্তান জেন্ডার ইনডেক্স অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রায় ৩৫ শতাংশ আফগান নারী আগের এক বছরে সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা জানান। বৈশ্বিক গড় ছিল ১৩ শতাংশ।

২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর নারীদের সুরক্ষায় থাকা সীমিত ব্যবস্থাও তুলে দেওয়া হয়। বিলুপ্ত করা হয় নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয়, নারী নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ প্রসিকিউটরের কার্যালয় ও আশ্রয়কেন্দ্রের নেটওয়ার্ক। প্রায় ২৫০ জন নারী বিচারককে অপসারণ করা হয়। নারী প্রসিকিউটরদেরও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

বর্তমান আফগান আইনে কোনো নারী নিজের মামলার সরাসরি পক্ষ হতে পারেন না। ফলে মায়েরা মেয়েদের জন্য ন্যায়বিচার চাইতে পারেন না। তাকহার প্রদেশে ২০২৫ সালের মে মাসে ২৩ বছর বয়সী এক তরুণীকে তার স্বামী ছুরিকাঘাত করে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেন। নিহতের মা শামসিয়া, ছদ্মনাম, জানান স্থানীয় আদালত তাকে স্বামীর নামে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, ‘একজন নারী কোনো আবেদন বা মামলার সরাসরি পক্ষ হতে পারেন না।’ কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার কোনো অগ্রগতি হয়নি।

সংখ্যা যা প্রকাশ করে না
সাংবাদিকরা নিহত বেশির ভাগ নারীর পরিবারের সাক্ষাৎকার নিতে পারেননি। ভয়ের কারণে অনেকেই মুখ খুলতে রাজি হননি। কয়েকটি প্রদেশে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করায় সাংবাদিকরাও হুমকি পান। এই ডেটাসেটের ২৩১টি ঘটনা আফগানিস্তানে নারী হত্যার মোট সংখ্যা নয়। এটি সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ড, বিচারহীনতা ও দায়মুক্তির একটি চিত্র তুলে ধরে।
লিজা শামসের মামলার বিচার সম্ভবত তালেবান আদালতেই হবে। দায়ীদের শাস্তি হবে বলে খুব একটা আশা করেন না তার বাবা। তাই মেয়ের জন্য ন্যায়বিচারের দাবিতে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রেকর্ডিং, হাসপাতালের ভিডিও ও বিভিন্ন নথি প্রকাশ করেছেন।

শামস বলেন, মুখ খোলার মূল্য তাদের ইতিমধ্যেই দিতে হয়েছে। লিজাকে হাসপাতালে নেওয়া তার দুই মেয়েকে পরে তালেবান তলব করে। তারা এখন আত্মগোপনে আছেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা গণমাধ্যমে কথা বলেছি বলেই এটি হয়েছে। তালেবান চায় না এ ধরনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসুক।’

প্রকাশিত রেকর্ডিংগুলোর একটিতে লিজা নিজের দাম্পত্য জীবন নিয়ে কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমি এসব সহ্য করছি। প্রতিদিন চেষ্টা করছি। কিন্তু আর হচ্ছে না। আমাদের জীবন এভাবে চলতে পারে না। আমি চাই না আমাদের সংসার তিক্ত হোক। আমার সন্তানরা বড় হচ্ছে। তারা আমাদের ঝগড়া দেখছে। এভাবে আর চলতে পারে না।’

*সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad