রংপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ১১ বছর বয়সী ছেলে সোহানের জন্য জরুরি ভিত্তিতে দুই ব্যাগ ‘বি-পজিটিভ’ রক্ত প্রয়োজন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রংপুর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ইউনিটের সামনে উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার বাবা ৫৮ বছর বয়সী শফিকুর রহমান। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা। ঠিক সেই মুহূর্তে মাস্ক পরা এবং গলায় নীল ফিতায় ঝোলানো পরিচয়পত্রধারী এক ব্যক্তি শফিকুর রহমানের কাছে এসে জানান যে, তার কাছে প্রয়োজনীয় রক্ত রয়েছে। তবে প্রতি ব্যাগের জন্য গুণতে হবে ৩ হাজার টাকা।
অথচ ঢাকা মেডিকেলের নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলায় সরকারি ব্লাড ব্যাংকে রক্ত থাকা সাপেক্ষে ইনডোর রোগীদের জন্য ক্রস ম্যাচিং ও স্ক্রিনিং ফি বাবদ খরচ হয় মাত্র ৭০০ টাকা। সরকারি এই সেবার সুফল পাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য যেন এক মরীচিকায় পরিণত হয়েছে। মুমূর্ষু রোগীর স্বজনদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোর চারপাশে গড়ে উঠেছে এক বিশাল ‘রক্ত-বাণিজ্য’ নেটওয়ার্ক।
ইজি বাইক চালক শফিকুর রহমান অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, তিনি পড়াশোনা জানেন না এবং তার কাছে এত টাকা নেই। সরকারি ফি ৭০০ টাকা হলে কেন তাকে ৩ হাজার টাকা দিতে হবে, সেই প্রশ্ন তার।
রাজধানীর ৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ২৪টি বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকে অনুসন্ধানে রক্ত সরবরাহকে ঘিরে গড়ে ওঠা দালালচক্রের এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশে নিবন্ধিত ব্লাড ব্যাংক আছে ২৬৭টি। বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হলেও এখন নিবন্ধিত ব্যাংকগুলোর মধ্যেই চরম অনিয়ম স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক আবু হুসাইন মোঃ মঈনুল আহসান স্বীকার করেন, সরকারি ব্লাড ব্যাংকগুলো রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী শতভাগ রক্ত সরবরাহ করতে পারে না। এই ঘাটতির সুযোগেই দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেলে ২ হাজার ২০০ শয্যার বিপরীতে প্রায় ৫ হাজার রোগী চিকিৎসা নেয়। অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে স্বাভাবিকভাবেই বাইরের সেবার ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়।
ঢাকা মেডিকেলের পাশেই ক্রিয়েটিভ ব্লাড ব্যাংক, বন্ধন ব্লাড ব্যাংক, স্বাধীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্লাড ব্যাংক, চানখাঁরপুল জেনারেল হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক এবং অ্যাকটিভ ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড ব্লাড ব্যাংক অবস্থিত।
চানখাঁরপুলের স্বাধীন ব্লাড ব্যাংকের ম্যানেজার মো. শাহীন আলম জানান, পজিটিভ রক্তের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরীক্ষা সহ ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। তবে নেগেটিভ রক্তের ক্ষেত্রে এই দাম ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত ঠেকে।
তিনি দাবি করেন, নেগেটিভ ডোনার পাওয়া কঠিন হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে তাদের আনতে হয়। যাতায়াত খরচ বাবদ এই বাড়তি টাকা নেওয়া হয়। ২০০৮ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী ৫টি টেস্টের ফি সব মিলিয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও শাহীন আলম এক পর্যায়ে স্বীকার করেন, লাভের সুযোগ থেকেই তারা এই বাড়তি টাকা নিচ্ছেন।
বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকগুলোর এই মূল্য অসংগতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক আবু হুসাইন মোঃ মঈনুল আহসান। তিনি জানান, ১ হাজার ৫০০ টাকার টেস্টের বদলে ৩ বা ৪ হাজার টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এমনটা হলে সেখানে অবশ্যই সমস্যা আছে। তিনি এখন পরীক্ষার খরচের পাশাপাশি রক্তের মূল্যও সরকার কর্তৃক নির্ধারণ করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চানখাঁরপুলের ক্রিয়েটিভ ব্লাড ব্যাংকে একই রক্তের দাম ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন চাওয়া হয়। এক ব্যাগ ‘বি পজিটিভ’ রক্তের জন্য কখনো ১ হাজার ৮০০ টাকা আবার কখনো ৩ হাজার টাকা দাবি করেন এর কর্মীরা। তারা ঢাকা মেডিকেলে রক্ত সরবরাহের কথা অস্বীকার করলেও ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে চানখাঁরপুল জেনারেল হাসপাতাল ও গ্রীন রোডের মুক্তি ব্লাড ব্যাংকে। সেখানকার কর্মীরা ‘সাইদুর রহমান অনিক’ নামে এক ব্যক্তির রেফারেন্স দেন, যিনি নিয়মিত ঢাকা মেডিকেলের জন্য রক্ত নিয়ে যান। যদিও অনিক দালালচক্রের অভিযোগ অস্বীকার করে একে কেবল ‘সাপ্লাই’ হিসেবে দাবি করেছেন।
রক্ত নিয়ে জালিয়াতির চিত্র আরও ভয়াবহ। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের একজন ওয়ার্ড মাস্টার জানান, গত বছর পর্যন্ত অসাধু ব্যবসায়ীরা এক ব্যাগ রক্তের সাথে স্যালাইন মিশিয়ে দুই ব্যাগ বানিয়ে ৩-৪ হাজার টাকায় বিক্রি করত। এই জালিয়াতি ধরা পড়ার পর এখন সেখানে নিজস্ব ডোনার ও কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন ছাড়া বাইরের রক্ত গ্রহণ বন্ধ করা হয়েছে।
রক্তে স্যালাইন মেশানো বা দালালচক্রের কার্যক্রম নজরদারি করা কঠিন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক। তিনি বলেন, নিয়মিত মনিটরিংয়ের চেয়ে তারা অভিযোগের ওপর বেশি নির্ভর করেন।
মিরপুর ও শ্যামলী এলাকার চিত্রও একই রকম। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের উল্টো পাশের মালিহা ব্লাড ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্লাড ব্যাংকের মতো লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলো রক্তে স্যালাইন মেশানোর দায়ে বন্ধ করা হয়েছে। মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের আদাবরের ফেমাস ব্লাড ব্যাংক ৩৫০০ টাকা চার্জ করলেও পরে মালিক তা অস্বীকার করে বলেন খরচ ১৬০০ টাকা। ২০০৮ সাল থেকে তারা কোনো ডোনারকে টাকা দেননি বলে দাবি করলেও অতিরিক্ত দামের বিষয়ে লাভের অজুহাত দেখান।
শ্যামলীর বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকগুলোতে রক্তের দাম ডিমান্ড ও সাপ্লাইয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। মোহাম্মদপুরের প্রাইম ব্লাড ব্যাংকের মার্কেটিং অফিসার মিজানুর রহমান এক জায়গায় এক ব্যাগ রক্তের দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা বললেও অন্য স্থানে একই রিকুইজিশন ফর্মের বিপরীতে ৩ হাজার ৫০০ টাকা দাবি করেন। সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি জানান, রক্ত কম থাকলে রেট বাড়ে।
শাহবাগের বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (পিজি হাসপাতাল) ৯০০ টাকায় রক্ত মিললেও সেখানে বাইরের ডোনারের মাধ্যমে আনা রক্তের আধিক্য দেখা যায়। জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটে স্টক না থাকলে রোগীরা বাইরে থেকে রক্ত আনে, তবে নিরাপত্তার খাতিরে কিডনি ইনস্টিটিউটকে পুনরায় সরকারি ফি নিয়ে সেই রক্ত স্ক্রিনিং করতে হয়।
সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিস্থিতি দেখা গেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ক্ষেত্রে। কামরাঙ্গীরচরের বৃদ্ধ আমিনুল হক ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন মেয়ের জন্য দুই ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করতে না পেরে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বাঁধন’-এর নেতাদের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তিনি টানা ১০ ঘণ্টা অপেক্ষা করলেও সংগঠনটির সংশ্লিষ্ট কেউ তার ফোন ধরেননি বা সাড়া দেননি।
দালালদের দৌরাত্ম্য, বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকের গলাকাটা ব্যবসা আর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদাসীনতার মাঝে শফিকুর রহমান বা আমিনুল হকের মতো হাজারো মানুষ আজ অসহায় ও জিম্মি।


