বিয়ের সময় নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও আসবাবপত্র পাওয়ার পরও থামেনি যৌতুকের দাবি। বিয়ের তিন বছর পর আরও এক লাখ টাকা না পেয়ে স্ত্রী রমা বিশ্বাসকে (২৫) গলায় নাইলনের সুতা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন স্বামী মনোজিত সরকার। পরে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করা হলেও ময়নাতদন্তে বেরিয়ে আসে হত্যার সত্যতা। সাত বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে স্বামী মনোজিত সরকারকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।
সোমবার দুপুরে ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) শামীমা পারভীন এ রায় ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে আসামিকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, জরিমানার পুরো অর্থ আদায় করে ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত মনোজিত সরকার আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তাই তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। একই মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মনোজিতের ছয় স্বজন–বিপুল সরকার, সরজিৎ সরকার, লিটন সরকার, বিপ্লব সরকার, সবুজ সরকার ও দীপালী সরকারকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
মামলার নথি ও এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের শুরুতে মধুখালী উপজেলার জারজননগর গ্রামের রঞ্জন বিশ্বাসের মেয়ে রমা বিশ্বাসের সঙ্গে একই উপজেলার কলাইকান্দা গ্রামের চিত্তরঞ্জন সরকারের ছেলে মনোজিত সরকারের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়।
এজাহার অনুযায়ী, বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে চার লাখ টাকা, সাড়ে তিন ভরি স্বর্ণালংকার এবং প্রায় ৫০ হাজার টাকার আসবাবপত্র দেওয়া হয়। এরপরও বিভিন্ন সময়ে আরও এক লাখ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও সন্তুষ্ট হননি মনোজিত। ২০১৮ সালের ৫ এপ্রিল তিনি আবারও এক লাখ টাকা দাবি করেন। দাবি পূরণ না হওয়ায় ২০ এপ্রিল বিকালে স্ত্রী রমা বিশ্বাসকে গলায় নাইলনের সুতা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।
ঘটনার পর মনোজিত মধুখালী থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন এবং রমার পরিবারের সদস্যদের জানান, পেটের ব্যথা সহ্য করতে না পেরে রমা আত্মহত্যা করেছেন। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি আত্মহত্যা নয়, শ্বাসরোধে হত্যা।
এরপর ২০১৮ সালের ১০ মে রমার বাবা রঞ্জন বিশ্বাস বাদী হয়ে মনোজিত সরকার ও তার ছয় স্বজনের বিরুদ্ধে যৌতুকের দাবিতে হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগে মধুখালী থানায় মামলা করেন।
তদন্ত শেষে মধুখালী থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) মাহাবুল করিম ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর সাতজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
এজাহারে রঞ্জন বিশ্বাস অভিযোগ করেন, বিয়ের পর থেকে তার মেয়ের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চলত। মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন সময়ে প্রায় এক লাখ টাকা অতিরিক্ত দেওয়া হলেও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। ঘটনার দিনও আরও এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে রমাকে হত্যা করে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) গোলাম রব্বানী ভূঁইয়া বলেন, যৌতুক এখনো সমাজের একটি ব্যাধি। যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন বা হত্যা করলে কেউ আইনের হাত থেকে রেহাই পাবে না।


