সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রাণী পালের একটি রিল ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া বিতর্ক নতুন মোড় নিয়েছে। ভিডিওটি নিয়ে বিউটি রাণী একটি মহলের ট্রোলের শিকার হলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ তার প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন।
খোদ শিক্ষা প্রশাসনও ভিডিও তৈরি করায় তার কোনো অন্যায় দেখছে না। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লেও তারও কোনো সত্যতা মেলেনি।
তবে ফেঞ্চুগঞ্জের কিছু মানুষ বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে প্রচার করছেন বলে অভিযোগ করেন বিউটি রাণী পাল। এরই মধ্যে তিনি একটি ফেসবুক পেজ ও পেজ পরিচালনাকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন।
কী করেছিলেন শিক্ষক বিউটি রানী পাল
চলতি বছর সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন বিউটি রাণী পাল। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিদ্যালয়ের পাঠদান, শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা, নাচ-গানের মাধ্যমে পাঠ শেখানো, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশবিষয়ক নানা কার্যক্রমের ভিডিও নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করে আসছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে শ্রাবনের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে… গানের সঙ্গে স্কুল প্রাঙ্গণে হাঁটার দৃশ্যসংবলিত একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন।
ভিডিওটিতে তাকে শাড়ি পরিহিত ও বেশ পরিপাটি অবস্থায় দেখা যায়। পরে ভিডিওটি একটি ফেসবুক পেজ থেকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে প্রচার শুরু করলে তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তিনি ভিডিওটি নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়ে নেন।
এ ঘটনায় তিনি শুক্রবার বিকালে ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি ফেসবুক পেজ ও এই পেজ পরিচালনাকারী আসিফ ইকবাল হিরণ নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি করেন। ফেঞ্চুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. লুৎফুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘একজন শিক্ষক ভিডিও ভাইরাল নিয়ে সাধারণ ডায়েরি করেছেন। এ বিষয়ে পুলিশ কাজ করছে।’
অভিনব প্রতিবাদ…
এদিকে পরিচ্ছন্ন একটি ভিডিও প্রকাশের জন্য বিউটি রাণীকে হেনস্তা করায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নারী শিক্ষক একই গান ব্যবহার করে নিজেদের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করতে শুরু করেন। বিউটি রানীর সঙ্গে সংহতি জানিয়ে বিভিন্ন পেশার নারী-পুরুষও একই ধরনের ভিডিও পোস্ট করেন।
সিলেট সদর উপজেলার শিক্ষক আবুল হোসেন তার এক পোস্টে লিখেছেন, বিষয়টি অত্যন্ত সাধারণ হলেও কেবল একজন নারী হওয়ায় বিউটি রাণী পালকে অযথা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। ভিউ ও প্রচারের আশায় অনেকেই এমন ঘটনাকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রিতা মণ্ডল নামে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, একজন শিক্ষিকাকে হেনস্তার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাহসী শিক্ষকদের সম্মান রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
সিলেট-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে একজন শিক্ষককে সামাজিকভাবে হেয় ও মানসিকভাবে চাপে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জের মতো ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির জনপদে এমন ঘটনা দুঃখজনক এবং সামাজিক মূল্যবোধের জন্যও বিব্রতকর।
সিলেটের মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, ওই ভিডিওতে অন্যায় কিংবা অশালীন কিছুই নেই। অথচ একটা মহল অপপ্রচার চালিয়ে বিষয়টিকে জটিল করার অপচেষ্টা করছে। একটি রিলস ভিডিও আপলোড করায় যেভাবে একজন মেধাবী ও সৃষ্টিশীল শিক্ষককে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা হলো বা হচ্ছে, এটা দুঃখজনক।
যা বলছেন শিক্ষক বিউটি ও কর্তৃপক্ষ
প্রধান শিক্ষক বিউটি রাণী পাল বলেন, ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি ফেসবুক পেজ ভিডিওটি ডাউনলোড করে নেতিবাচকভাবে প্রচার করেছে। ওই পেজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আসিফ ইকবাল হিরণ গত কয়েকদিন ধরে তাকে সামাজিকভাবে হেনস্তা করেছেন।
তিনি বলেন, নতুন করে ‘প্রিয় ফেঞ্চুগঞ্জ’নামে আরেকটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটি নেতিবাচকভাবে প্রচার করা হচ্ছে। যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি তার ভুল স্বীকার না করেন, তবে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা করতে বাধ্য হবেন বলে জানান শিক্ষক বিউটি রানী পাল।
এই পরিস্থিতিতে মানসিক বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন উল্লেখ করে বিউটি রাণী পাল বলেন, ‘ফেঞ্চুগঞ্জের স্থানীয় কিছু ব্যক্তি ফেসবুক লাইভে এসে সমালোচনা করছেন। এ অবস্থায় কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে নিজেকে অনিরাপদ মনে হচ্ছে।’
সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশাদ বলেন, ‘একজন শিক্ষকের রিল ভিডিও বানানোকে আমরা অন্যায় হিসেবে দেখছি না। এ ঘটনায় কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। বিষয়টি ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।’
বিষয়টি নিয়ে রোববার সিলেট সফরকালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সাংবাদিকদের জানান, তিনি ভিডিওটি দেখেননি। তবে অন্যদের কাছ থেকে জেনেছেন, এতে কোনো অশ্লীলতা নেই। তিনি বলেন, ‘গান গাওয়া বা এমন একটি ভিডিও প্রকাশ করাকে আমি অন্যায় মনে করি না। কেউ একমত হোক বা না হোক, আমার অবস্থান সেটিই।’
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করা বিউটি রাণী পাল ২০১৬ সালে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। চাকরি জীবনের শুরু থেকেই তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। ২০২৬ সালে পেয়েছেন সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক পদক।


