আকাশে উড়ে যাওয়া উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের সামান্য শব্দেও এখন হৃৎস্পন্দন যেন থেমে যায় উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলের বেঁচে ফেরা শিক্ষার্থীদের। এই শব্দ তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই বিধ্বংসী মুহূর্তে, যখন তাদের মনে হয়েছিল আকাশটাই বুঝি মাথার ওপর ভেঙে পড়ছে।
গত ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনে বিস্ফোরিত হয় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান। সেই বিস্ফোরণ শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠ আর শ্রেণিকক্ষে যে তাণ্ডব চালিয়েছিল, আনন্দ-হাসি-গানের শ্রেণিকক্ষকে যে আগুন আর হাহাকারের জায়গায় পরিণত করেছিল; তা আজও ভুলতে পারে না শিক্ষার্থীরা। যেদিন একটি যুদ্ধবিমানের জেট ফুয়েল মুহূর্তেই ক্লাসরুমকে পরিণত করেছিল আগুনের কুণ্ডে, যা গ্রাস করে নিয়েছিল সবকিছু। কেবল রেখে গিয়েছিল ৩৬টি মৃতদেহ আর আহত ১৭২ জনকে।
মাইলস্টোনের ইংরেজির শিক্ষক অভিজিৎ অধিকারী বলেন, ‘যখনই স্কুলের ওপর দিয়ে কোনো বিমান উড়ে যায়, শিশুরা চমকে ওঠে। কেউ কেউ কান ঢেকে ফেলে। ওরা ভাবে এটা আবার বিধ্বস্ত হতে যাচ্ছে। এমনকি আমি নিজেও বিমান উড়ে গেলে চমকে উঠি।’
সোমবার রোটারি ক্লাব অব বনানী এবং ছুটি রিসোর্টের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছিল একটি বিশেষ সেশনের। ‘মাইলস্টোনের সাহসী হৃদয়গুলো একসঙ্গে সেরে উঠুক’ শিরোনামে পূর্বাচলের ছুটি রিসোর্টে আয়োজিত এই সেশনে অংশ নেয় ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির ৪০ শিক্ষার্থী। যেখানে ছিল থেরাপিউটিক সেশনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম।
সেশন চলাকালে, শিক্ষার্থীরা তাদের প্রিয় খাবার, ঘ্রাণ এবং প্রাকৃতিক অনুভূতির কথা জানায়। সেইসঙ্গে কীভাবে তারা প্রকৃতির উপাদানগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে, তাও খুঁজে বের করে। অনেকেই এই তুলনা থেকে এক ধরনের শক্তি পায়। কেউ কেউ নিজেদের গাছের সঙ্গে তুলনা করে, তারা বর্ণনা করে যে কীভাবে অনেক ঝড় সহ্য করেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থেকেছে। কেউ নিজেকে প্রজাপতির সাথে তুলনা করে, যা রূপান্তর এবং ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতীক।

কয়েকজন বলে যে তারা জলের মতো হতে চায়, শান্ত এবং সব পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম। আবার কেউ হতে চায় আকাশের মতো বিশাল ও উন্মুক্ত।
অষ্টম শ্রেণির রোহান খুব কম কথা বলে, বিশেষ করে চোখে চোখ রেখে কথা বলে না বললেই চলে। সেদিনের বিস্ফোরণে তার বন্ধু তানভীর মারা গেছে।
খুব শান্তভাবে রোহান বলল, ‘ও আমার স্বপ্নে আসে। কখনো দেখি ও দৌড়াচ্ছে, কখনো পুড়ছে।’
প্রায় প্রতি রাতেই রোহান সেই দুর্ঘটনার স্বপ্ন দেখে। তবে স্বপ্নে সব বাস্তবের মতো দ্রুত ঘটে যায় না। খুব ধীরগতিতে সে দেখতে পায়, একটি উড়োজাহাজ আছড়ে পড়ছে, শিশুরা চিৎকার করছে, আঙিনা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে আগুন।
রোহান বলে, ‘আমার আর স্কুলে যেতে ভালো লাগে না।’
সে জানাল, দুর্ঘটনার পর থেকে তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু জায়ন আর স্কুলে ফেরেনি; তার পরিবার তাকে কক্সবাজারে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গেছে।
আক্ষেপের সঙ্গে রোহান বলে, ‘ফুটবল দলটা শেষ হয়ে গেছে। আমার বন্ধুরা চলে গেছে। স্কুলটা আর আগের মতো নেই।’
ছেলের এই নীরবতা, প্রতি রাতের দুঃস্বপ্ন নিয়ে ভীষণ চিন্তিত তার বাবা-মা। রোহানকে একটি আর্ট স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছেন, এই আশায় যে ছবি আঁকা হয়ত তার মনের কষ্ট কমাতে সাহায্য করবে। কিন্তু এখনো সে সন্ধ্যাবেলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বিমানের গতিপথ অনুসরণ করে।
ছুটি রিসোর্টের আর্ট সেশনে অনেক শিক্ষার্থীই ক্যানভাসে উজ্জ্বল কমলা, লাল এবং কুচকুচে কালো রঙ বেছে নিয়েছিল। যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর যে আগুন তাদের স্কুলকে গ্রাস করেছিল, এগুলো হলো সেই আগুনের রঙ।
এমনকি কেউ কেউ পোড়া স্কুল ভবনটিও আঁকার চেষ্টা করে। কেউ কেউ কাগজের নৌকায় তাদের প্রয়াত বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বার্তা লিখে সেগুলো স্মৃতির মতো পানিতে ভাসিয়ে দেয়।
এই অনুশীলনের মাধ্যমে ফুটে ওঠে তাদের গভীর মানসিক ক্ষত। যাদের সঙ্গে তারা একসময় হাসি, গোপন কথা এবং টিফিন ভাগাভাগি করে নিত, তাদের হারিয়ে ফেলার এই ক্ষত তরুণ হৃদয়গুলোর জন্য ভীষণ ভারী বোঝা।
ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তাহসিন তার কষ্টের কথা বেশ খোলাখুলিই বলল। বিমান দুর্ঘটনায় বড় বোন তাসনিয়াকে হারিয়েছে সে। তাসনিয়া অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত।

যুদ্ধবিমানটি যখন আছড়ে পড়ে তখন তারা দুই ভাইবোন আলাদা ভবনে অবস্থান করছিল। তাহসিন তার বোনকে বাঁচাতে খেলার মাঠের মধ্য দিয়ে ছুটে গিয়েছিল। সেখানে অপরিচিত কারও নির্দেশে স্যালাইন এবং পানি আনা-নেওয়ার কাজে সাহায্যের চেষ্টা করেছিল।
আইসিইউতে ২৮ দিনের কঠিন লড়াইয়ের পর তাসনিয়া তার প্রিয় ভাইকে ছেড়ে চলে যায়। আর্ট সেশনের শেষে তাহসিন তার বোনের কাছে একটি চিঠি লেখে।
তাহসিন বলে, ‘একমাত্র ওর সঙ্গেই আমি আমার মনের কথা বলতাম। এখন আমি কারও সঙ্গে কিছু বলতে পারি না। আমি আমার সেরা বন্ধুকে হারিয়ে ফেলেছি।’
ষষ্ঠ শ্রেণির আরেক ছাত্র তাহরিম আশরাফ এখনো স্মরণ করে বন্ধু শামীমের সঙ্গে শেষ কথোপকথনটি। সেদিন শামীমের খুব তাড়া ছিল, একথা স্মরণ করে সে বলল, ‘আমরা গেটের কাছে কথা বলছিলাম, হঠাৎ ও বলল ওকে উপরে যেতে হবে। দুই মিনিট পরেই দুর্ঘটনাটি ঘটে।’
তাহরিমের এখনো মনে হয়, সে যদি আর কিছুক্ষণ কথা চালিয়ে তে তাহলে হয়ত শামীম বেঁচে যেত। আর এই অপরাধবোধ তাকে কুরে কুরে খায়। যে ক্যান্টিনে তারা দুই বন্ধু একসঙ্গে নাশতা করত, সেই ক্যান্টিন এখন তাহরিমের জন্য অসহ্য হয়ে উঠেছে।
তাহরিম বলল, ‘আমি আর ক্যান্টিনে খাই না। শামীমের চেয়ারটা সেখানে খালি পড়ে থাকে।’
প্রায় রাতেই তাহরিম স্বপ্নে শামীমকে দেখতে পায়। যেখানে দেখতে পায়, শামীম তার দাদা-দাদির সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, হাসছে আর কথা বলছে।

আগামী বছর বাবা-মা স্কুল বদল করার কথা ভাবছেন বলে জানাল তাহরিম। তাদের আশা, স্কুল পরিবর্তন হলে হয়ত ছেলের মানসিক অবস্থার উন্নতি হবে।
ইনোভেশন ফর ওয়েলবিয়িং ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মনিরা রহমান সতর্ক করে বলেন, ‘কিছু শিশু এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যদি তাদের দ্রুত শনাক্ত করে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দেওয়া না হয়, তাহলে এটি তাদের বিকাশে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।’
‘তাদের আঘাত-পরবর্তী মানসিক অবস্থা থেকে উদ্ভূত বিষণ্নতা জীবন থেকে আনন্দ খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারে।’
এক শিক্ষার্থীর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘সে প্রথমে নিজেকে একটি পাতার সঙ্গে তুলনা করেছিল, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই স্বীকার করে যে সে জানে না যে সে কে বা সে কী হতে চায়!’
সেদিন শুধু সপ্তম শ্রেণিরই সাত শিক্ষার্থী নিহত হয়েছিল। সহপাঠী আরিফ হোসেন লিমন তাদের স্মৃতিগুলো নিজের মোবাইল ফোনে খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছে।
সে দ্রুত স্ক্রল করে তার বন্ধু সামিরের একটি ছবি দেখায়। যেখানে স্কুল ইউনিফর্মে একটি হাস্যোজ্জ্বল ছেলেকে দেখতে পাওয়া যায়।
লিমন বলেন, ‘ও বারান্দায় ছিল। ঘটনাস্থলেই মারা যায়।’
দুর্ঘটনার ক্ষত কাটিয়ে স্কুল খোলার পর পরিবেশ ছিল ভীষণ নীরব। যে নীরবতা অনেকটা দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
লিমন বলে, ‘স্কুল খোলার পর খালি খালি লাগত। ফুটবল দলটা শেষ হয়ে গেছে। অনেক শিক্ষক চলে গেছেন। নতুনদের আমার আর নিজের বলে মনে হয় না।’
লিমনের ট্রমা রঙ এবং শব্দের সঙ্গে জড়িত। সেদিন তার মা তাকে নিতে আসতে দেরি করেছিলেন। ফলে মায়ের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে সে দুর্ঘটনার পরবর্তী দৃশ্য দেখেছিল। যেখানে ছিল সারিবদ্ধ পোড়া, সাদা মরদেহ।
এখন লিমন বলে, ‘যখনই আমি সাদা কিছু দেখি, আমার সেই বিকেলের কথা মনে পড়ে।’

এমনকি বাড়িতেও কোনো কিছু পড়ার শব্দেও সে চমকে ওঠে। লিমন বলল, ‘আমি সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকি, কোনো শব্দ পেলেই মনে হয় সেটা বুঝি বিমানের মতো।’
আর্ট থেরাপি সেশন পরিচালনার সময় মনিরা দারুণ বিষয় খেয়াল করেছেন।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘অনেক শিশুই এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার এবং শক্ত থাকার চেষ্টা করছে। তারা পড়াশোনায় ফিরে আসার চেষ্টা করছে। তবে, এক্ষেত্রে তাদের পরিবার ও শিক্ষকদের সমর্থন প্রয়োজন।’
‘পরিবার ও শিক্ষক কতটা সহায়তা দিতে পারছেন, তারা শিশুদের চাহিদা কতটা ভালোভাবে বুঝতে পারছেন সেই মূল্যায়নটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
ইংরেজির শিক্ষক অভিজিৎ অধিকারী যিনি দিনের পর দিন এই শিশুদের পড়িয়েছেন, চোখের সামনে বেড়ে উঠতে দেখেছেন তার জন্য এই ট্র্যাজেডি ভীষণ ব্যক্তিগত। তার অন্যতম মেধাবী ছাত্রী মায়ার নামটিও ছিল নিহতের তালিকায়।
অভিজিৎ বলেন, ‘আমি যখনই তার ক্লাসরুমের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই, আমি ওর মুখ দেখতে পাই।’
মায়াকে লেখাপড়ায় অনুপ্রেরণা দিতে অভিজিৎ একবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন, সে বৃত্তি পেলে তিনি তার দেশের বাড়িতে বেড়াতে যাবেন। সেই কথা রাখতে না পারলেও তিনি মায়ার নিজ শহর মেহেরপুরে গিয়েছিলেন তাকে শেষ বিদায় জানাতে।
দুর্ঘটনার দিনের কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসজল চোখে অভিজিৎ টাইমসকে বলেন, ‘আমি জ্বলন্ত ঘর থেকে শিশুদের বের করে আনতে সাহায্য করেছিলাম। তাদের চিৎকারের স্মৃতি এখনো আমাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না। ধোঁয়ার গন্ধ, তাদের কণ্ঠস্বর; আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না।’
‘কিন্তু এরপরেও আমি শক্ত থাকার চেষ্টা করি। কারণ বেঁচে থাকা শিশুরা ভরসা পেতে আমার দিকে তাকায়।’

শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে নিজেই কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন অভিজিৎ। যার মধ্যে রয়েছে ছোট ছোট খেলার আয়োজন করা, দলবদ্ধভাবে গল্প বলার সেশনের আয়োজন।
তিনি বলেন, ‘ওরা হাসতে ভুলে গেছে। যদি আমরা তাদের আবার আনন্দ খুঁজে পেতে সাহায্য না করি, তবে বন্ধুদের চেয়েও বেশি কিছু হারাবে।’
মাইলস্টোন স্কুলটি আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু যে প্রাঙ্গণটি এক সময় শিক্ষার্থীদের ফুটবল খেলার কলরবে মুখরিত থাকত তা এখন নীরব।
তবুও, সেরে ওঠার পথ শুরু হয়েছে। মনিরা রহমান টাইমসকে বলেন, ‘শিশুদের শিল্পকর্মগুলো আঘাত-পরবর্তী মানসিক চাপের সাধারণ লক্ষণগুলো প্রকাশ করে। যদিও তারা শক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বারবার দুঃস্বপ্ন দেখা, ওই ঘটনার কথা মনে করতে না চাওয়া, উদ্বেগ এবং অপরাধবোধ; সব মিলিয়ের তাদের অবস্থা গভীরভাবে উদ্বেগজনক।’
রোহান, তাহসিন, তাহরিম, লিমন এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীর জন্য স্বাভাবিক জীবন এখনো নাগালের বাইরে। স্কুলের ঘণ্টা আগের মতোই ঢং ঢং করে বেজে ওঠে, ক্লাসও চলে। কিন্তু বেঁচে ফেরা শিশুদের মনে হয়, ২১ জুলাই দিনটি শেষই হয়নি।
রোহান মৃদুস্বরে বলে, ‘কিছু কিছু রাতে আমি স্বপ্ন দেখি যে বিমানটি এখনো পড়ছে। আর আমি সেই শিশুটিকে দেখতে পাই যে গায়ে আগুন নিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিল।’


