যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ড পেতে হলে আবেদনকারীদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়ে নতুন নীতি আনছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই নীতি বাস্তবায়ন হলে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে স্থায়ীভাবে বসবাস ও কাজ করার অনুমতি প্রত্যাশী লাখো মানুষের জীবন ও পরিকল্পনা ওলটপালট করে দিতে পারে।
শুক্রবার ঘোষিত নতুন নিয়মে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্রিন কার্ডের আবেদনকারীদের স্থায়ী ভিসার জন্য দেশের বাইরে থেকে আবেদন করতে হবে। অর্থাৎ, আবেদন যাচাই-বাছাই চলমান অবস্থায় তাদের আর যুক্তরাষ্ট্রে থেকে প্রক্রিয়া শেষ করার সুযোগ থাকবে না।
সিএনএনের খবরে বলা হয়, এই আকস্মিক নীতিগত পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক অভিবাসী সরাসরি প্রভাবিত হতে পারেন। গ্রিন কার্ড পাওয়ার আশায় থাকা মানুষদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হলে পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হবে। অনেককে চাকরি ছাড়তে হতে পারে এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সামাজিক স্থিতিও ব্যাহত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ডের আবেদন প্রক্রিয়া এমনিতেই দীর্ঘ ও জটিল, এটি শেষ হতে কয়েক মাস থেকে শুরু করে বহু বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
দেশটির নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা সংস্থার মুখপাত্র জ্যাক কাহলার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিশেষ পরিস্থিতির’ ক্ষেত্রে এই নিয়মে কিছু ছাড় রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যখন বিদেশিরা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে গ্রিন কার্ডের আবেদন করেন, তখন যাদের আবেদন বাতিল হয় তারা যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এমন ঝুঁকি কমাতেই গ্রিন কার্ডের আবেদনকারীদের নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার নীতি বাস্তবায়নের কথা ভাবছে প্রশাসন। এতে অবৈধ অভিবাসীদের খুঁজে বের করা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করার প্রয়োজনও কমে যায়।’
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছরে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দেশটিতে বৈধ স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা পেয়েছেন।
তবে আইনজীবীরা বলছেন, নতুন এই নিয়ম আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। শুক্রবার ঘোষণার পর থেকেই অভিবাসন আইনজীবী, আইনপ্রণেতা এবং অভিবাসন অধিকারকর্মীদের পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ডেলিয়া সি. রামিরেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এই নীতি ‘নির্মমতার সীমা’ ছাড়িয়ে গেছে। তিনি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগকে ‘টুকরো টুকরো’ করে ভেঙে দেওয়ারও আহ্বান জানান।
নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল এক্সে লিখেছেন, ‘যে প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে এই দেশ গড়ে উঠেছে নতুন এই নীতি তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।’
অ্যারিজোনার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি গ্রেগ স্ট্যানটন বলেন, ‘ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবেই বৈধ অভিবাসনকে আরও কঠিন করে তুলেছেন। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সেরা গবেষক, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের আকৃষ্ট করতে পারে মূলত আমাদের কর্মভিত্তিক ভিসা কর্মসূচিগুলোর কারণে।’
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি টেড লিউ এই নীতিকে ‘বোকামি’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এতে যোগ্য আবেদনকারীরা যুক্তরাষ্ট্রে শ্রম দেওয়ার আগ্রহ হারাবে, যার ফলে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোই লাভবান হবে।’
ক্যাটো ইনস্টিটিউটের অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা পরিচালক ডেভিড জে. বায়ার এক ব্লগ পোস্টে এই নীতিকে ‘অযৌক্তিক’ বলে উল্লেখ করেছেন।
বায়ার লেখেন, ‘এটি মেধাবী মানুষদের অন্য দেশে চলে যেতে উৎসাহিত করবে এবং ব্যবসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কম প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।’
অবৈধ অভিবাসন দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকারের একটি হলেও, নতুন এই নিয়ম দেখিয়ে দিচ্ছে- তার প্রশাসন এখন বৈধ অভিবাসনের পথও সীমিত করার চেষ্টা করছে।
এর আগে প্রশাসন আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ বা বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের সাময়িক সুরক্ষিত মর্যাদা বাতিল করেছে। ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনের ভয় ছাড়াই থাকার সুযোগ হারিয়েছেন। শুধু তাই নয়, কাজ ও শিক্ষাভিত্তিক ভিসার ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে দেশটির অভিবাসন বিভাগ।
গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নেওয়ার পর ওয়াশিংটনে দুই ন্যাশনাল গার্ড সদস্যকে গুলি করে হত্যার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে চিহ্নিত ১৯টি দেশের নাগরিকদের দেওয়া সব গ্রিন কার্ড আবারও পর্যালোচনার ঘোষণা দেয় তার প্রশাসন।
অবশ্য ওই হামলায় অভিযুক্ত আফগান নাগরিক ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন, যা ২০২৫ সালে অনুমোদিত হয়। তার আবেদন গ্রিন কার্ড আবেদনের প্রক্রিয়া থেকে ভিন্ন ছিল।


