ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। পরিবারের জন্য দুমুঠো খাবারের ব্যবস্থা করতে বগুড়ার এরুলিয়ার ‘কামলার হাটে’ জড়ো হয়েছিলেন একদল মানুষ। তাদের মধ্যে সাতজন বাড়িতে ফিরেছেন নিথর হয়ে।
শুক্রবার ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই সেখানে কাজের খোঁজে আসা মানুষের জীবনে নেমে আসে আঘাত।
একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হাটে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিকদের ওপর উঠে যায়। ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হন। পরে হাসপাতালে আরও চারজনের মৃত্যু হয়।
সাপ্তাহিক ছুটির এই দিনটিতে সড়কে ঝড়েছে বহু প্রাণ। বগুড়াতেই আরও একটি দুর্ঘটনা স্বামী স্ত্রী এবং সিলেটে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হানায় নয়জন।
‘স্বপ্নের হাটে’ রক্তের বন্যা
এরুলিয়ার হাটটি বগুড়াতে হলেও এখানে উত্তরের আরও দূরের জনপদ গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা কৃষি শ্রমিকরা কাজের জন্য অপেক্ষায় থাকেন।
কেউ কৃষি জমিতে কাজের ডাকের আর হিসেব কষছিলেন, কেউ দিন হাজিরার ৭০০ টাকার মজুরিতে সংসারের বাজার করবেন ভাবছিলেন। কিন্তু মুহূর্তেই সব ধূলিস্যাত।
শ্রমিক নিতে মোটরসাইকেলে চেপে সেই হাটেই যাচ্ছিলেন জমির মালিক নূর মোহাম্মদ। কাছাকাছি পৌঁছেও যান তিনি। কিন্তু ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা নওগাঁগামী শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের একটি বাস তার মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। রাস্তায় ছিটকে পড়েন নূর মোহাম্মদ। মোটর সাইকেল বাসের নিচে চলে যায়। এরপর বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হাটে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিকদের ওপর উঠে যায়।
ঘটনাস্থলে তিনজন নিহত হন। পরে হাসপাতালে আরও চারজনের মৃত্যু হয়।
নিহতরা হলেন কৃষি শ্রমিক তাজিমুল, বেল্লাল হোসেন, আবু সাঈদ, আনারুল, আমিরুল, নূর আলম এবং জমির মালিক নূর মোহাম্মদ।
আহত হন আরও ১৭ জন, যাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বগুড়া বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেওয়ার পর সেটি বাসের নিচে চলে যায়। এতে বাসটি স্লিপ করে রাস্তা থেকে নিচে নেমে যায়। চালক বাসটি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলেও তা আর সম্ভব হয়নি।’
তার ধারণা, ভোরবেলায় চালক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন অথবা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর বাসের চালক ও তার সহযোগী পালিয়ে গেছেন। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও অন্যান্য আলামত যাচাই করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে, আহতদের চিকিৎসার খোঁজ নিতে শুক্রবার দুপুরে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহকারী ব্যক্তিগত চিকিৎসক আ ন ম মনোয়ারুল কাদির বিটু।
তিনি জানান, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে। কারও উরুর হাড়, কারও বাহুর হাড় এবং কয়েকজনের চোয়ালের হাড় ভেঙেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সবার চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হবে এবং চিকিৎসায় কোনো ধরনের গাফিলতি না করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে হতাহতদের জন্য আর্থিক সহায়তার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্বজনরা ছুটে আসেন বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। জরুরি বিভাগ ও মর্গ এলাকা মুহূর্তেই ভারী হয়ে ওঠে কান্না আর আহাজারিতে।
স্বামীকে হারিয়ে পাগলপ্রায় আবু সাঈদ মণ্ডলের স্ত্রী রিনা বেগম। বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন তিনি। স্বজনরা সামলানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু তাদের চোখ দিয়েও ঝরছিল জলের ধারা।
রিনা চিৎকার করে বলছিলেন, ‘সাঈদ আমাকে একা ফেলে কোথায় চলে গেলে?’
সাঈদ ও আমিরুলের স্বজন সানাউল প্রধান জানান, তারা দুজনই ছিলেন হতদরিদ্র দিনমজুর। সাঈদের ছয় সদস্যের পরিবার পুরোপুরি তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। আর আমিরুল ছিলেন ভূমিহীন। শ্বশুরবাড়ির এলাকায় এক শতক জায়গায় ছোট্ট একটি ঘর তুলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন।
শ্রমিক মোশাররফ হোসেন সরকার জানান, কাজ পেলে একজন দিনে প্রায় ৭০০ টাকা মজুরি পান। সেই টাকাতেই চলে তাদের পরিবারের খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা এবং নিত্যদিনের জীবন।
বিকালে বগুড়ায় গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছেন মোটরসাইকেল আরোহী স্বামী-স্ত্রী৷ এরা হলেন জেলার আটাপাড়া এলাকার বাবুল হাসান ও জেসমিন বিবি। বাবুল স্বর্ণ ব্যবসায়ী ছিলেন।
সকালের দুর্ঘটনা স্থলের অদূরে এরুলিয়া বিমানবন্দর এলাকায় বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে৷
বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহীম আলী বলেন, মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে মোটরসাইকেলে করে নওগাঁ যাচ্ছিলেন বাবুল। সঙ্গে তার নাতিও ছিল। একইদিকে যাওয়া একটি কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়৷
ঘটনাস্থলেই বাবুল হাসান মারা যান। জেসমিন ও তাদের নাতিকে উদ্ধার করে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক জেসমিনকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রাইভেট কার জব্দ করা হয়েছে। তবে চালক পলাতক রয়েছেন৷
সিলেটে ঝড়ল ৯ প্রাণ
সিলেটের ওসমানীনগরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুই যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের সাতজন ঘটনাস্থলে এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে একজন ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন মারা যান।
আরও ১৪ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করতে পারে পুলিশ। তারা হলেন, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরীনা লক্ষ্মীপুর গ্রামের সাইফুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বারি মিয়ার পুত্র আবুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার চণ্ডীবের গ্রামের বাবলু মিয়ার মেয়ে সঙ্গীত শিল্পী পেহেলি ভৈরবী, কুমিল্লার লাকসাম থানার রফিকুল ইসলামের ছেলে আরমান হোসেন রাহিম, ঢাকা বিক্রমপুরের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলমের তিন বছর বয়সী শিশুকন্যা জাইফা ইসলাম ও সিলেট নগরীর সোবহানিঘাট এলাকার উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রীতম।
বাকি তিন জনের আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে পরিচয় সনাক্তকরণের কাজ করছে তদন্ত সংস্থা পিবিআই।
পুলিশ জানিয়েছে, ওসমানীনগরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ইউনিক পরিবহনের বাসটি মহাসড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়।
খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার অভিযান চালায়।
শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের ওসি আনিসুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনার কারণে কিছু সময় মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হলেও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক উমর রাশেদ মুনির জানান, আহতদের একজনকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে এবং অপরজনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।


